ওমানে সুযোগ না পাওয়া রাকিবের প্রথম শ্রেণিতে ৫ উইকেট

কপাল খুললে ওমান সফর করা হতে পারত বাঁহাতি স্পিনার রাকিব হাওলাদারের। গত এপ্রিলের ইয়ুথ ক্রিকেট লিগে চার ইনিংসে ১৩টি উইকেট শিকার করে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাম্পে ডাক পেয়েছিলেন তিনি। তবে ওমানে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের দলে শেষ পর্যন্ত জায়গা হয়নি তার। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের এই প্রতিযোগিতায় নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ না পেলেও ভাগ্যের লিখন যে ভিন্ন ছিল, তা কে জানত! গত এপ্রিলে ইয়ুথ ক্রিকেট লিগে ৪ ইনিংসে ১৩ উইকেট নিয়েছিলেন। তাঁকে স্বাভাবিকভাবেই তখন ঘিরে ধরেছিল হতাশা। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের রেলগাড়িতে চলতে না পারলে দৌড়ে পিছিয়ে পড়তে হয়। পরে যখন তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায়, তখন তুষার (ইমরান) স্যার আমাকে বলেছিলেন যে তোর খেলতে হতে পারে, তৈরি থাক।’।

বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচি থেকে ছিটকে পড়ার হতাশাকে সঙ্গী করেই বড়দের ক্রিকেটে পা রেখেছেন এই তরুণ। বয়স ১৮ পার হওয়ার আগেই তিনি নাম লিখিয়েছেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে। জাতীয় ক্রিকেট লিগে চট্টগ্রামের বিপক্ষে ম্যাচের একাদশে শুরুতে না থাকলেও বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে দুর্দান্ত এক রেকর্ড গড়েছেন রাকিব। অভিষেকেই পাঁচ উইকেট শিকার করে তিনি ক্রিকেট মহলে সাড়া ফেলে দিয়েছেন। শুধু অভিষেক বললেও ঠিকঠাক বোঝানো যায় না ঘটনাটা, অভিষেকেই তিনি পেয়ে গেছেন ৫ উইকেটও। সেখানেও আবার নাটকীয়তা, তিনি যে ম্যাচে ৫ উইকেট পেয়েছেন, সেই ম্যাচের একাদশেই ছিলেন না। বদলি নেমে অভিষেকে ৫ উইকেট রাকিবের; খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটের জয়। তা জাতীয় লিগে খুলনার প্রধান কোচের মুখেই শুনুন, ‘অনেক কষ্ট করে সবাইকে রাজি করাতে হয়েছে। বড়দের ক্রিকেটের কোনো সংস্করণেও পা পড়েনি। তাঁরই কিনা একটা ম্যাচের মাঝপথে মাঠে নেমে যেতে হচ্ছে। রাকিবের উত্তরে মিশে থাকে কৈশোরের সারল্য, ‘শুরুতে একটু ভয় ভয় লেগেছিল।’। সেই ভয়টা তাঁর কেটে গেছে সামিউনের ‘লাইক টু লাইক’ বদলি হিসেবে মাঠে নামার পর। ঘরোয়া ক্রিকেটে সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারের ইতি টেনে অনেক দিন ধরেই তিনি কোচিংয়ে নাম লিখিয়েছেন।

ম্যাচের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে রাকিব জানান, খুলনা দলের বাঁহাতি স্পিনার সামিউন বাসীর মাথায় বলের আঘাত পান।

ব্যাটিংয়ের সময় এই চোট পাওয়ার পর ড্রেসিংরুমে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নিতে হয়। কিন্তু ড্রেসিংরুমে ফেরার পর ওনার খারাপ লাগতে শুরু করে।

ঠিক তখনই তুষার ইমরান তাকে খেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। অভিষেক ম্যাচে প্রথমদিকে কিছুটা নার্ভাস থাকলেও সিনিয়র খেলোয়াড়দের উৎসাহ তাকে সাহস যুগিয়েছে। মিঠুন ও মেহেদী হাসানের মতো সিনিয়ররা তাকে সহজাত বোলিং চালিয়ে যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন।

রাকিবকে জাতীয় ক্রিকেট লিগের দলে অন্তর্ভুক্ত করার পেছনে বড় অবদান রেখেছেন কোচ তুষার ইমরান। যুব পর্যায়ের ক্রিকেটে রাকিবকে পর্যবেক্ষণ করে তার মধ্যে লম্বা সময় বোলিং করার অদ্ভুত ক্ষমতা লক্ষ্য করেছিলেন তুষার। নির্বাচকদের সাথে দীর্ঘ ৪৫ মিনিটের আলোচনায় রাকিবকে দলে নেওয়ার জন্য তাকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। নির্বাচকরা তাকে আগে কোথাও খেলে আসার পরামর্শ দিলেও তুষার নিজের অবস্থানে অটল ছিলেন। নির্বাচকদের সঙ্গে যে মিটিং ছিল, ওখানে শুধু রাকিবকে নিয়েই ৪৫ মিনিট কথা বলতে হয়েছে। আম্পায়ারিংয়ের ‘চুরি’ ধরতে ড্রোন কিনবে বিসিবি।

যদিও তুষারের পরিকল্পনা ছিল রাকিবকে দলের সঙ্গে রেখে আগামী মৌসুমের জন্য প্রস্তুত করা, কিন্তু ভাগ্যের ফেরে ম্যাচেই অভিষেক হয়ে গেল তার। খুলনা দীর্ঘদিন ধরে একজন কার্যকর বাঁহাতি স্পিনারের অভাব বোধ করছিল, যা রাকিব নিজের প্রথম ম্যাচেই ঘুচিয়ে দিয়েছেন। নিজের এই অভিষেক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, বড় মঞ্চের জন্য তিনি প্রস্তুত। কিন্তু তিনি জানতেন না, নিয়তি তাঁর জন্য লিখে রেখেছিল ভিন্ন এক গল্প।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে বাঁহাতি স্পিনারদের গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক হতে চান রাকিব। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ম্যাচে পাঁচ উইকেট নিয়ে তিনি সেই যাত্রার শুভসূচনা করলেন। এখন তার সামনে লক্ষ্য এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। তার এই অভাবনীয় সাফল্য যেন ঘরোয়া ক্রিকেটের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিল।