স্কুল-কলেজে এগিয়ে মেয়েরা, উচ্চশিক্ষা ও চাকরিতে কেন পিছিয়ে

প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থায় ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের অংশগ্রহণ অনেক বেশি লক্ষ্য করা যায়। তবে উচ্চশিক্ষার স্তর বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এই চিত্রের বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের হার ৫১ দশমিক ২ শতাংশ, মাধ্যমিকে ৫৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং কলেজ পর্যায়ে তা প্রায় ৫২ শতাংশ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই এই হার ৪০ শতাংশের নিচে নেমে আসে। এর মধ্যে স্কুল অ্যান্ড কলেজের উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ছাত্রী ৫৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক কলেজে ৫৩ শতাংশ। প্রতিবছর দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে শিক্ষা পরিসংখ্যান প্রকাশ করে ব্যানবেইস। প্রাথমিক শিক্ষায় গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান, গবেষণায় বরাদ্দ সর্বোচ্চ ২ লাখ। শূন্য পদ প্রায় সোয়া ৫ লাখ।

উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের এই পিছিয়ে পড়ার পেছনে বিভিন্ন বাস্তব চ্যালেঞ্জকে দায়ী করছেন শিক্ষাবিদরা।

এর মধ্যে পর্যাপ্ত আবাসন সংকটের অভাব, যাতায়াত ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা এবং বিয়ের সামাজিক চাপ অন্যতম। উচ্চশিক্ষার জন্য বাড়ির বাইরে থাকা, পর্যাপ্ত আবাসনের অভাব, নিরাপদ যাতায়াতের সীমাবদ্ধতা, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ও বিয়ে—এসব বিষয় অনেক মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোর বাইরে পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ১১ লাখ ১৩ হাজার। এর মধ্যে ছাত্রীদের হার ৩৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ। বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ আরও কম, যা প্রায় ৩৫ শতাংশের মতো। তবে প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী এর ব্যতিক্রমও রয়েছে; যেমন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীর হার ৪৯ শতাংশ এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তা প্রায় ৫৫ শতাংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী প্রায় ৪২ শতাংশ। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের হার প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ৫০ শতাংশের বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে অবশ্য এ চিত্রে পার্থক্য রয়েছে। মেডিকেল ও কৃষিশিক্ষার কিছু প্রতিষ্ঠানেও নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলক ভালো।

উচ্চশিক্ষা পেরোনোর পর কর্মজীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈষম্য ফুটে উঠছে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বর্তমানে নারীর অংশগ্রহণ ৩০ শতাংশের নিচেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের সরকারি কর্মচারী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে সরকারি চাকরির মোট অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জনের মধ্যে পুরুষ ১০ লাখ ৪২ হাজার ৫৬২ জন এবং নারী ৪ লাখ ২১ হাজার ৭৮৮ জন। অর্থাৎ সরকারি চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, পড়াশোনা শেষে সরকারি চাকরিতেও নারীর অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত পর্যায়ে নয়, এখনো তা ৩০ শতাংশের কম। শিক্ষায় বৈষম্য বেড়েই চলছে, কোচিং-প্রাইভেট বাড়ছে, সঙ্গে ব্যয়ও। আবার সরকারি চাকরিতে নারীর কম প্রতিনিধিত্বের কারণ শুধু পারিবারিক সিদ্ধান্ত বা বদলির নীতিতে সীমাবদ্ধ—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যাবে না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সরকারি কর্মচারীদের পরিসংখ্যান–২০২৫ অনুযায়ী, দেশে সরকারি চাকরির মোট পদ ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২টি। বিপরীতে পুরুষের অংশ ৭১ শতাংশের বেশি।

উচ্চপর্যায়ের সরকারি পদগুলোতে নারীর প্রতিনিধিত্ব আরও নগণ্য। প্রথম গ্রেডের মোট ১ হাজার ১০৩ জন কর্মকর্তার মধ্যে নারী মাত্র ১৬২ জন, যা প্রায় ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া প্রথম থেকে নবম গ্রেড পর্যন্ত কর্মরত ২ লাখ ৬ হাজার ৯৭৩ জন কর্মকর্তার মধ্যে নারীর হার মাত্র ২২ দশমিক ৭ শতাংশ বা ৪৬ হাজার ৯২৫ জন। যদিও এই পরিসংখ্যান সরকারি খাতের, তবে বেসরকারি খাত বা তৈরি পোশাকশিল্পের মতো অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে নারীদের বিপুল অংশগ্রহণ রয়েছে, যা এই খাতের বাইরে অবস্থান করছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী এই বিষয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ সহজ করার পাশাপাশি নিরাপদ আবাসন ও যাতায়াত ব্যবস্থার মতো মৌলিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মেয়েরা কেন উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছেন, তার কারণগুলো সুনির্দিষ্ট গবেষণার মাধ্যমে বের করতে হবে। তিনি আরও যোগ করেন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সমান সুযোগ প্রদানের পাশাপাশি কর্মপরিবেশকে নারীবান্ধব করা আবশ্যক। পেশাগত ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় সাধনের সুযোগ থাকলে নারীদের কর্মজীবনে দীর্ঘমেয়াদী অংশগ্রহণ সহজতর হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ কম হওয়ার পেছনে কোন কারণ কতটা দায়ী, তা বিশদ গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

দীর্ঘদিন ধরেই দেশে শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা অর্জনের দাবি শোনা যাচ্ছে, বিশেষ করে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) আওতায় ২০১৫ সালের আগেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে সমতা অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু উচ্চশিক্ষা ও পরবর্তী কর্মসংস্থানে সেই অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। স্কুল-কলেজের সফলতাকে উচ্চশিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রের সমান সুযোগের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা দিতে হলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।