পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিং মান দিল্লি বিমানবন্দরে হেনস্তার শিকার হওয়ার নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলেছেন। শুক্রবার রাজ্য বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী জানান, ফ্রান্সের প্যারিস থেকে ফেরার সময় দিল্লি বিমানবন্দরে তাঁকে অহেতুক তিন ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছিল। এ সময় তাঁর মালপত্র তল্লাশি করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত ৫০ হাজার রুপি জরিমানার চালান ধরিয়ে দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, এই পুরো ঘটনার পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন ভারতীয় শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তা মণীশ কুমার, যিনি ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ভাই। মণীশ কুমারের পরিচয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উনি ইন্ডিয়ান রেভিনিউ সার্ভিসের (আইআরএস) কর্মকর্তা, দিল্লি শুল্ক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত।’। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘শুল্ক বিভাগের কর্মীরা বারবার বলতে থাকেন, আমার জিনিসপত্র তল্লাশি করা হবে। তল্লাশি শেষে কিছুই না পাওয়ায় তাঁরা আমাকে যেতে দেন। রাজনৈতিক দিক থেকে কংগ্রেসও আপের প্রতিপক্ষ। ভিসামুক্ত এ করিডর দিয়ে ভারতীয় পুণ্যার্থীরা কারতারপুর যাওয়া-আসা করে থাকেন।
মুখ্যমন্ত্রী মান দাবি করেন, শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তারা প্রথমে তল্লাশির কথা বলে সময়ক্ষেপণ করছিলেন। পরে কোনো কিছু না পেয়ে ওপর মহলের চাপের কথা বলে জোরপূর্বক ৫০ হাজার রুপি জরিমানা আদায় করেন। তিনি বিষয়টিকে বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর আগে আন্তর্জাতিক খাদ্যমেলায় যোগ দিতে প্যারিস যাওয়ার অনুমতি দিতেও কেন্দ্রীয় সরকার অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তবে পরবর্তীতে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের নির্দেশে তিনি ১৭ থেকে ২১ অক্টোবর সফরে যান। যখন বেরোচ্ছি, তখনই সেই কর্মকর্তারা আবার এসে বলেন, ওপর মহল থেকে তাঁদের ওপর খুব চাপ রয়েছে। এ সময়েই বিজেপির উদ্দেশে মান বলেন, ‘এভাবেই ওরা প্রতিশোধ নেয়। হাইকোর্টের নির্দেশেই তিনি ১৭ থেকে ২১ অক্টোবর প্যারিস যান ‘এসআইএএল প্যারিস ২০২৬’ আন্তর্জাতিক খাদ্যমেলায় যোগ দিতে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পাঞ্জাব বিধানসভায় শুক্রবার সিইসি জ্ঞানেশ কুমার ও ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।
অনেক সদস্য সিইসির পদত্যাগের দাবিও জানিয়েছেন। যদিও প্রস্তাবটি পাস হওয়ার সময় সভায় কংগ্রেস, শিরোমনি অকালি দল ও বিজেপির কোনো সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। অন্যদিকে, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বিজেপি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক অনিল সারিন মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করে বলেন, মুখ্যমন্ত্রী দায় এড়াতে এই অভিযোগ তুলছেন। তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন, জরিমানার কারণ জানতে চাইলে সরকারি কাগজ জনসমক্ষে আনা হোক। জরিমানার সেই কাগজ প্রকাশ্যে আনলেই বোঝা যাবে। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী গুরপ্রীত কৌরও ছিলেন।
অনিল সারিন আরও দাবি করেন, প্রটোকল অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী বিশেষ সুবিধা ও তল্লাশি থেকে ছাড় পেলেও তাঁর সঙ্গীরা সেই সুবিধার আওতায় পড়েন না। মুখ্যমন্ত্রী মানের বিদেশ সফর নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের দীর্ঘদিনের বিরোধের কথা উল্লেখ করে বিজেপির পক্ষ থেকে এই অবস্থান জানানো হয়। পাঞ্জাবে ক্ষমতাসীন আম আদমি পার্টির (আপ) সঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক রেষারেষি অনেক পুরনো, যা এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিদেশ সফরের চরিত্রসহ নানা বিষয় বিবেচনা করে কেন্দ্র ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ ইস্যু করে। দেশভাগের পর কারতারপুর পাকিস্তানের পাঞ্জাবে পড়ে।
শুল্ক কর্মকর্তা মণীশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী লাহোরে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব পাঞ্জাবি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার অনুরোধ পাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন। আগামী ২৭ নভেম্বর সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। মান আক্ষেপ করে বলেন, ফ্রান্সের মতো পাকিস্তান ভ্রমণের অনুমতি পাওয়া নিয়েও তিনি সন্দিহান। তিনি শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক দেবের স্মৃতিবিজড়িত কারতারপুর সাহেব গুরুদ্বারে বিধানসভার সব পক্ষকে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। গুরদাসপুর সীমান্ত থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরের এই করিডরটি তীর্থযাত্রীদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। নভেম্বর মাসের ২৭ তারিখ সেই সম্মেলন হবে। অথচ এ দেশ থেকে বহু পাঞ্জাবি কবি ও লেখক পাকিস্তান যাবেন। দুই দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি যে এক।’। শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক দেব তাঁর জীবনের শেষ ১৮ বছর কারতারপুরে কাটিয়েছেন। তাঁর স্মৃতিতে তৈরি হয় দরবার সাহেব গুরুদ্বার।

