মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় গ্রাফটিং পদ্ধতিতে টমেটোর চারা উৎপাদন এক নতুন কৃষি বিপ্লবের জন্ম দিয়েছে। এই পদ্ধতিতে তিত বেগুন বা বনবেগুনের শক্তিশালী শিকড়ের সঙ্গে টমেটোর চারা জুড়ে দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট অংশ কেটে জোড়া দেওয়ার পর পলিথিন দিয়ে বেঁধে কয়েক দিনের বিশেষ পরিচর্যায় চারাগুলো স্থায়ী রূপ পায়। জোড়া লাগার পর ১০ থেকে ১২ দিন চারাগুলো নির্দিষ্ট ঘরে রেখে শক্ত করে তোলা হয়। এভাবেই তৈরি হচ্ছে উন্নত জাতের গ্রাফটিং টমেটোর চারা, যা এখন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ, পটুয়াখালী, হবিগঞ্জ ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হচ্ছে। ক্যাপশন ২: তিত বেগুনের শিকড়ের সঙ্গে টমেটোর অংশ জুড়ে তৈরি হচ্ছে গ্রাফটিং চারা। এসব চারার জীবনকাল বেশি হওয়ায় এর চাহিদা শুধু কমলগঞ্জেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেও ব্যাপক।ক্যাপশন ৩: বিভিন্ন স্থানে চারাগুলো পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আদমপুরে।
উপজেলার আদমপুর, জালালপুর, বনগাঁও, কান্দিগাঁও, মধ্যগাঁও ও নাজাতকোনাসহ বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৩০০ নার্সারি গড়ে উঠেছে। স্থানীয় কৃষি কার্যালয়ের তথ্যমতে, এই নার্সারিগুলোতে বছরে প্রায় ৬৫ লাখ চারা উৎপাদিত হচ্ছে। প্রতিটি চারা ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হয়, যার মাধ্যমে বছরে সাত কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। এই মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ ও নার্সারি কার্যক্রম চলছে। কৃষি বিভাগের মতে, গ্রাফটিং করা এই চারা সাধারণ গাছের তুলনায় অধিক শক্ত ও রোগ প্রতিরোধী। সাধারণ টমেটোর গাছ যেখানে তিন মাস বাঁচে, সেখানে গ্রাফটিং করা গাছ আট মাস পর্যন্ত ফলন দিতে সক্ষম।
চারা তৈরির এই পদ্ধতিতে স্থানীয় শত শত শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। শ্রমিকেরা একটি চারা গ্রাফটিংয়ের জন্য এক টাকা করে মজুরি পান। একজন দক্ষ শ্রমিক দৈনিক ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০টি পর্যন্ত চারা জোড়া লাগাতে পারেন। স্থানীয় আরিফ হাইব্রিড টমেটো নার্সারির মালিক এম এ করিম জানান, তিনি এক সময় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন এবং সেখান থেকে অবসর নেওয়ার পর এই পেশায় যুক্ত হয়েছেন। তাঁর নার্সারিতে সপ্তাহে প্রায় ৮০ হাজার চারা বিক্রি হয়, যেখানে তিন শিফটে ৬০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। গ্রাফটিংয়ের কাজ একবার শিখে নিলে তা থেকে ভালো আয় করা সম্ভব হওয়ায় অনেক কৃষকই নতুন করে এই ব্যবসায় আগ্রহী হচ্ছেন। দৈনিক একেকজন শ্রমিক ১ হাজার ২০০ পর্যন্ত চারা তৈরি করতে পারেন। শ্রমিক সুমন মিয়া গ্রাফটিংয়ের কাজের সঙ্গে নিয়োজিত।
তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ বিজ্ঞানসম্মত। তিত বেগুনের চারা উপযুক্ত করতে ৩৫ দিন এবং টমেটোর চারা তৈরিতে প্রায় ২৫ দিন সময় লাগে। এরপর সমান আকৃতির চারাগুলো বাছাই করে গ্রাফটিং করা হয়। কৃষি কর্মকর্তা মো. রাকিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, গ্রাফটিং চারা সহজে ঢলে পড়ে না এবং রোগবালাই কম হয়। কৃষকদের ব্যাপক অংশগ্রহণে এই খাতটি প্রতিনিয়ত বড় হচ্ছে এবং হাজারো কৃষক এই চারা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। চাকরি থেকে অবসরের পর সেনাবাহিনীর একটা প্রজেক্টে রংপুরে গিয়ে গ্রাফটিং টমেটোর চারা তৈরির কাজ শেখেন। সেখানে দীর্ঘদিন কাজ করার পর কমলগঞ্জে এসে এই চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সন্দ্বীপ তালুকদার জানান, তিনি মাঠপর্যায়ে গ্রাফটিং চারা উৎপাদনের কার্যক্রম পরিদর্শন করেছেন। এটি এই অঞ্চলের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় কৃষি খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তিনি আরও বলেন, কৃষকেরা যাতে আরও উন্নত পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করতে পারেন এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কৃষকদের কাছে এই চারা সহজে পৌঁছানো যায়, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে।

