সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত প্রবাসী মো. শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ দেশে পৌঁছেছে। শুক্রবার সকালে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁর মরদেহ এসে পৌঁছালে তা গ্রহণ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। পরে সরকারের পক্ষ থেকে নিহতের স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয় এবং আর্থিক সহায়তার একটি চেক দেওয়া হয়। এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে এই পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস ব্যক্ত করেন প্রতিমন্ত্রী। বাবার মরদেহ নিতে স্বজনদের সঙ্গে বিমানবন্দরে এসেছিল তারাও।
নিহত শাহেদ আহম্মেদ বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের বাসিন্দা।
তিনি সৌদি আরবের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে জেদ্দা প্রকল্পে প্লাম্বার পদে কর্মরত ছিলেন এবং তাঁর বৈধ আকামা ছিল। এর আগে তিনি দুবার সৌদি আরবে গিয়েও কাজের সুব্যবস্থা করতে না পেরে ফিরে এসেছিলেন। পরবর্তীতে প্রায় দুই বছর আগে তিনি আবারো সৌদিতে যান। সেখানে কিছুদিন শ্বশুরের কাছে থাকার পর তাঁর মাধ্যমে প্রথমে চালকের চাকরি নেন। পরে কর্মস্থল পরিবর্তনের কারণে তিনি জেদ্দায় চলে যান এবং তাঁর শ্বশুর দাম্মামেই থেকে যান। কিন্তু কাজের টানে ফিরতেই হয়েছিল শাহেদকে।
দীর্ঘ দিন পর গত ৭ সেপ্টেম্বর এক মাস তিন দিনের ছুটিতে দেশে এসেছিলেন শাহেদ। ছুটি কাটিয়ে আবার কর্মস্থলে ফেরার উদ্দেশে ১০ অক্টোবর সৌদি আরবে পৌঁছান তিনি। রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থানের সময় হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। এর আগে ভাই মারা যাওয়ার পর তিনি ছুটি কাটাতে দেশে এসেছিলেন এবং রিয়াদ হয়েই তাঁর জেদ্দায় যাওয়ার কথা ছিল। সে যাওয়ার আগে থেকেই কেমন যেন লাগছিল, আগে কখনো এমন ভয় লাগেনি। এবার ভালোভাবে কাজ করবেন, পরিবারের জন্য কিছু করবেন, সংসারের হাল ধরবেন—এমন প্রত্যাশা ছিল সবার।
বিমানবন্দরে স্বামীর মরদেহ গ্রহণ করতে এসে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন স্ত্রী কহিনুর আক্তার কাকলী। তিনি জানান, এবার দেশে ফিরে শাহেদ বেশিরভাগ সময় পরিবার, স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গেই কাটিয়েছেন, কোথাও আড্ডা দিতে যাননি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি নিয়ে মনে ভয় থাকায় তাঁকে আর সৌদিতে পাঠাতে চাননি কহিনুর। তবে শাহেদ কাজের তাগিদে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং দেশ ছাড়ার আগে স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, পৌছেই ফোন করবেন। সেই এক-দেড় ঘণ্টার অপেক্ষাই তাঁর জীবনে চিরতরে থেমে গেল। এক-দেড় ঘণ্টা পর বাসায় গিয়ে তোমাকে ফোন দেব। কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্না আটকাতে পারছিলেন না কহিনুর আক্তার কাকলী। এই সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে কিংবা বাইরে ঘুরতে যেতেন না। গাড়ি চালানোর লাইসেন্স জমা দিয়ে সেই চাকরিতে যোগ দেন। আমি চাই, আমার সন্তানদের নিয়ে যেন সারাটা জীবন বেঁচে থাকতে পারি।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে শাহেদের সঙ্গে পছন্দের সম্পর্কে বিয়ে হয়েছিল ২৬ বছর বয়সী কহিনুরের। এখন তাঁদের সংসারে দুটি সন্তান রয়েছে—১০ বছর বয়সী কাউসার এবং ৫ বছর বয়সী জিহাদ। ছোট দুই সন্তান ও বাবাকে হারিয়ে দিশেহারা এই পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। কহিনুর তাঁর শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সার্বিক সহযোগিতা ও সহায়তা প্রার্থনা করেছেন। জিহাদের বয়স মাত্র পাঁচ বছর, আর কাউসারের বয়স ১০ বছর। এত অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে এখন দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে সামনে এগোবেন, সেই চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছে তাঁর মনে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বৃদ্ধির কারণে গত ছয় মাসে নিহত মোট ১১ জন বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। শাহেদ ছিলেন সেই তালিকার ১১তম ব্যক্তি। এছাড়া শেষ এক মাসেই সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মোট তিনজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শাহেদের মরদেহ আজ দেশে এল। বাকি নিহতদের মরদেহ দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে আনার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াকরণ চলছে। ওদের দায়িত্ব নেওয়ার মতো আর কেউ নেই।
উল্লেখ্য, কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন, যার মধ্যে বড় একটি অংশ রয়েছে সৌদি আরবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমাগত হামলায় প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং অনেকে হতাহত হচ্ছেন। সম্প্রতি দেশটিতে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিরা কয়েক দফা হামলা চালিয়েছে।
এছাড়া আঞ্চলিক এ সংঘাতের পাশাপাশি বিচারিক প্রক্রিয়ার কারণেও অনেক বাংলাদেশি জটিলতায় রয়েছেন। সরকারের দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে সৌদির কারাগারে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি বন্দি আছেন এবং দুজনের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের অনুলিপি চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যোগাযোগ রক্ষা করছে। গত বছরের তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে প্রায় ৫৯ জন বিদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যাদের মধ্যে বাংলাদেশিও রয়েছেন। সৌদিতে এ বছরের প্রথম ৬ মাসে ৫৯ বিদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, আছে বাংলাদেশিও।

