জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে গুরুত্ব পাবে মেট্রোরেল

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের এক সরকারি সফরে আজ রাতে টোকিও যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার ২৬ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত তার এই সফরসূচি নির্ধারিত হয়েছে। সফরে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করা হবে।

সফরসূচি অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী আগামী সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। সেখানে জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নাকাসোনে ইয়াসুতাকা তাকে স্বাগত জানাবেন। সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে অবস্থান করবেন।

সফরের প্রথম দিন সোমবার বিকালে প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগের সভাপতি তারো আসোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। ওই দিনই তিনি জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকি এবং জাইকার প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকার সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন। সন্ধ্যায় নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার দেওয়া নৈশভোজে অংশ নেবেন তিনি।

সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

গার্ড অব অনার গ্রহণের পর অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, উন্নয়ন সহযোগিতা ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।

বিশেষ গুরুত্ব পাবে ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় কমানো এবং জাপান থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার হ্রাসের বিষয়টি। এছাড়া অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ ত্বরান্বিত করার বিষয়েও আলোচনা হবে। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানো, বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং ব্যবসায়িক আস্থা জোরদারের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে। দেশটি ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ প্রকল্পে সহযোগিতা দিয়ে আসছে।

একই দিন তিনি জাপানের চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরে জেরা (জেইআরএ)-এর স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। এরপর ইচিকাওয়া শহরে নিটসু লজিস্টিকস হাব ঘুরে দেখবেন প্রধানমন্ত্রী।

সফরের তৃতীয় দিন ২৮ অক্টোবর জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর কাজুহিকো আমাকাওয়া এবং জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকার সঙ্গে বৈঠক করবেন। এছাড়া ইউনিক্লোসহ জাপানের বেশ কিছু শীর্ষ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক ও বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন তিনি। সন্ধ্যায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে তার। পরে তিনি জাপানের তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লোর সদর দপ্তরে প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। জাপানের আরও ১৪টি বিশিষ্ট কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে দুটি দলীয় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হবে। গত ২০ অক্টোবর বাংলাদেশ ও জাপান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ সফরের ঘোষণা দেয়।

শেষ দিন ২৯ অক্টোবর শিনকানসেন বা বুলেট ট্রেনে নাগোয়া যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে টয়োটা মোটর করপোরেশনের মটোমাচি কারখানা পরিদর্শন ও টয়োটা সুসো করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সব কার্যক্রম শেষে ২৯ অক্টোবর তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন এবং বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, দ্বিপক্ষীয় এই সফরে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বেসামরিক বিমান পরিবহন এবং ব্লু ইকোনমিসহ বিভিন্ন খাতে অন্তত তিনটি বা চারটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে। গত ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরিত হওয়ায় এই সফর বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর থেকে জাপান বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগী। এর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ ও ১৯৮০ সালে এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯৪ ও ২০০৫ সালে জাপান সফর করেছিলেন। এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন প্রতিমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ডাক।

বাংলাদেশ জাপানের সঙ্গে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০২৬-৩১ মেয়াদে ১৩.৮ বিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ প্যাকেজের প্রস্তাব প্রস্তুত করছে। এর মধ্যে পরিবহণ, বন্দর, শিল্পায়ন, জ্বালানি ও জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এ সময় লিগের জ্যেষ্ঠ সদস্য এবং জাপানের ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী তাতসুনোরি ইবায়াশিও উপস্থিত থাকবেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও গবেষণার মতো নতুন ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এতে পরিবহণ ও নগর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার, মাতারবাড়ীসহ সমন্বিত শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে ৩.১৪ বিলিয়ন ডলার, উৎপাদন ও ইলেকট্রনিকস খাতে ১.৫৭ বিলিয়ন ডলার, জ্বালানি ও সবুজ রূপান্তরে ১.২৬ বিল। এ ছাড়া কৃষি, ওষুধশিল্প, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, ব্লু ইকোনমি, পর্যটন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ অন্যান্য খাতে ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত প্যাকেজের কিছু উদ্যোগ বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় (বিআইজি-বি) উদ্যোগের আওতাভুক্ত। এতে পরিবহণ ও নগর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার, মাতারবাড়ীসহ সমন্বিত শিল্প, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে ৩.১৪ বিলিয়ন ডলার, উৎপাদন ও ইলেকট্রনিকস খাতে ১.৫৭ বিলিয়ন ডলার, জ্বালানি ও সবুজ রূপান্তরে ১.২৬ বিলিয়ন ডলার এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো। 3, 45, 14, 1, 57, 26, 940.