তাহসিফের রহস্যজনক মৃত্যু: রিমান্ডে জুনিয়র বন্ধু, সিসিটিভিতে তরুণীর সন্ধান

Published: November 1, 2026, 2:26 am

বিমানবাহিনীর বরখাস্ত হওয়া ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। নিখোঁজ হওয়ার আগে ঘটনার রাতে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্ট ও বারে এক তরুণীর সঙ্গে তাকে সময় কাটাতে দেখা গেছে। সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে ওই তরুণীকে শনাক্তের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। অন্যদিকে এ ঘটনায় তাহসিফের বাবার করা মামলায় তার জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে নৌপুলিশ।

তদন্ত সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপের আহ্বানে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন তাহসিফ। এরপর থেকে তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। সুরতহালের সময় ট্রাউজারের পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে উদ্ধারকৃত মরদেহটি তাহসিফের বলে নিশ্চিত হন স্বজনেরা।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা একটি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানতে পেরেছেন, ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে তাহসিফ ও তার এক বান্ধবী মোটরসাইকেলে চড়ে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ যান। গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস পরিহিত আনুমানিক ২৪-২৫ বছর বয়সী ওই তরুণীর হাতে একটি সাদা পলিথিন ছিল। সে সময় হেলমেট পরা অবস্থায় দীপও তাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কাটান তারা। গোয়েন্দারা ইতিমধ্যে ওই তরুণীর ছবি সংগ্রহ করেছেন এবং তাকে শনাক্তের চেষ্টা চলছে, কারণ তার বক্তব্য এই ঘটনার আগের পরিস্থিতি স্পষ্ট করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে উত্তরার সোনারগাঁও জনপথ রোডের ১৩ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ তাকে ওই তরুণীর সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। পরিবারকে কী ধরনের সহযোগিতা করা যায়, তা জানতে চেয়েছেন তারা।

ঘটনার পর গত বৃহস্পতিবার রাতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিবিআই দীপকে হেফাজতে নেয়। পিবিআই সদস্যরা তাকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে শুক্রবার রাতে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। ওই রাতেই তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিম হেলাল বাদী হয়ে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটিতে হেফাজতে থাকা দীপকে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেফতার দেখানো হয়।

শনিবার দুপুরে দীপকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন নৌপুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন। শুনানি শেষে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ঘটনার দিন তাহসিফকে নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন দীপ এবং প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, মাজার বস্তি এলাকায় পোশাক পরা দুজন পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখে তারা দুজন দুই দিকে দৌড় দেন। একপর্যায়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন বলে দীপের দাবি। তবে ওই পুলিশ কর্মকর্তারা প্রকৃতপক্ষে কারা ছিলেন, কেন তারা ধাওয়া করেছিলেন এবং তাহসিফ কেন নদীতে ঝাঁপ দিতে গেলেন—তা যাচাই করছে পুলিশ। এছাড়া টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তাহসিফের মোটরসাইকেল কীভাবে পৌঁছাল, সেই বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে মাদকসেবনের অভিযোগে টহল পুলিশ তাদের ধাওয়া করে থাকতে পারে, তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি। তবে তিনি কেন নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, এরপর কী ঘটেছিল কিংবা তার মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে-এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। সেখান থেকে কীভাবে তাহসিফ তুরাগ নদে গেলেন, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। জিজ্ঞাসাবাদে বেশকিছু তথ্য সামনে আসছে।

নৌপুলিশ ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, দীপ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাহসিফের সঙ্গে ছিলেন, তাই তাকে জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হতে পারে। রিমান্ডে দীপের দেওয়া নানা তথ্যে কিছু অসঙ্গতি ও এলোমেলো বক্তব্য পাওয়া গেছে, যা অন্যান্য আলামত ও সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফের বিস্তারিত যাতায়াত, মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং আলামত হিসেবে মোটরসাইকেল উদ্ধারের কাজ জোরদার করা হয়েছে। তারা আশা করছেন, দ্রুত প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উন্মোচন ও দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের কল্যাণ সংস্থা ‘রাওয়া’। শনিবার দুপুরে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে তাহসিফের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সমবেদনা জানান সংগঠনটির নেতারা।

পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে রাওয়ার যুগ্মসম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম জানান, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ করছে। সাবেক সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য এই মৃত্যু অত্যন্ত বেদনার এবং তারা ঘটনার সঠিক তদন্ত চান। সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর আল আমিন স্পষ্ট করেন যে, তারা এই মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।