পোশাক খাতে অস্থিরতায় ইন্ধন: গোয়েন্দা নজরদারিতে অসাধু চক্র

Published: November 3, 2026, 6:31 am

তৈরি পোশাক খাতে সাম্প্রতিক সময়ে ছড়িয়ে পড়া অনাকাঙ্ক্ষিত শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে কেবল শ্রমিকের দাবিই নয়, বরং একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সক্রিয় ইন্ধন ও গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে বলে নিশ্চিত হয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, সাধারণ শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসাধু কিছু চক্র ডিসেম্বর মাসকে লক্ষ্য করে মাঠ উত্তপ্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত এই শিল্পকে অচল করে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, মূলত ডিসেম্বর মাসকে টার্গেট করে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার লক্ষ্যে অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসাবে পরিচিত গার্মেন্টশিল্পকে টার্গেট করেছেন তারা। অনুসন্ধান, গোয়েন্দা প্রতিবেদন, গার্মেন্ট মালিক ও সাধারণ শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। এজন্য মালিক-শ্রমিক সবাইকে সতর্ক থাকবে হবে। খুব সহজেই এই শিল্পের সহজ-সরল শ্রমিকদের মোটিভেট করা যায়।

তৈরি পোশাক শিল্পের এই অস্থিরতার নেপথ্যে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পতিত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী ও কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের নেতা। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত রোববার মিরপুর, গাজীপুর ও সাভার এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এসব ব্যক্তি কেবল ইন্ধনই দিচ্ছেন না, বরং পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে নেপথ্যে থেকে অর্থায়ন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক বার্তা ছড়াচ্ছেন। ইতোমধ্যেই জড়িতদের অনেককে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং বাকিদের ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সরকারের সর্বোচ্চ মহলের কাছে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ ও দায়ীদের তালিকা জমা দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় তাদের কর্মীদের শ্রমঘন শিল্প এলাকায় নানামুখী প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ষড়যন্ত্রকারীরা কেবল কারখানা ভাঙচুর বা শ্রমিক আন্দোলনে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তাদের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, মেট্রোরেল ও কেপিআইভুক্ত এলাকা। এসব স্থানে নাশকতা ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে আতঙ্ক ছড়িয়ে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার ছক এঁকেছেন তারা। শিল্প এলাকায় মেট্রোরেল, ব্যাংক ও স্পর্শকাতর স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা থাকায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিরাপত্তা জোরদার ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে। শীর্ষ মহলের সংকেত পেলেই এ বিষয়ে বড় ধরনের অভিযান চালানো হবে। এমনকি গুজব ছড়িয়ে সহিংস ঘটনা ঘটানোর আশঙ্কাও করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসলিমা আখতার এ বিষয়ে বলেন, মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন স্বাভাবিক। তবে এখন যা দেখা যাচ্ছে, তা শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা। তিনি আরও উল্লেখ করেন, কারখানা ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর যেসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে, তা সাধারণ কোনো শ্রমিকের কাজ হতে পারে না। তাসলিমা আখতারের মতে, মালিকদের উচিত দ্রুত মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে মজুরি নির্ধারণ করা; অন্যথায় গণ-অভ্যুত্থানবিরোধীরা এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পূর্ণ সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে। এক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ করলে গণ-অভ্যুত্থানবিরোধীরা সুযোগ নেবে।

সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার মনে করেন, এই আন্দোলনকে কোনোভাবেই ‘সুস্থ’ বলা সম্ভব নয়। অনেক শ্রমিক কাজে যোগ দিতে চাইলেও তাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে, কারখানায় ঢিল ছোড়া হচ্ছে এবং জোরপূর্বক আন্দোলনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, গঠনমূলক আন্দোলন কেউ বাধা দেবে না, তবে দিনশেষে শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায়ভার শ্রমিকদের ওপরই বর্তাবে।

বাংলাদেশ এমপ্লায়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, মজুরি বোর্ড গঠনের পর এই আন্দোলনের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। তার মতে, একটি অসাধু গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে দেশের অর্থনীতি পঙ্গু করতে পোশাকশিল্পকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। তিনি আরও বলেন, শিল্পমালিকরা সবসময়ই শ্রমিকদের অবদানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু কারখানায় ভাঙচুর বা নাশকতায় কোনো সাধারণ শ্রমিকের অংশগ্রহণ অসম্ভব। এই অপশক্তির ইন্ধনদাতাদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় না আনতে পারলে শিল্পখাতকে স্বাভাবিক রাখা কঠিন হবে।