যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষের রাজনীতি: টেক্সাসে শঙ্কায় মুসলিমরা

Published: November 3, 2026, 8:46 am

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে দেশজুড়ে ইসলামবিদ্বেষ ও মুসলিমবিরোধী বক্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। টেক্সাস রাজ্যে কয়েক বছর ধরেই মুসলিমদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য ও নীতিনির্ধারণী তৎপরতা চলছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় মুসলিম ভোটাররা। যদিও এবার রাজ্যজুড়ে কোনো মুসলিম প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না, তবুও এই নির্বাচনের গুরুত্ব ও প্রভাব তাদের কাছে অত্যন্ত ব্যাপক। দল-মত নির্বিশেষে মুসলিম ভোটারদের অনেকেই আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, তারা রাজনৈতিক নেতাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চান—যাতে কোনো দলের রাজনৈতিক স্বার্থে মুসলিমদের ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা না হয়। বিশেষ করে মুসলিম প্রার্থীদের ঘিরে রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণায় বিদ্বেষের বিষয়টি সামনে এসেছে। মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের মতো নেতারা এর অন্যতম উদাহরণ। সেখান থেকে পাওয়া ধারণার কারণে শিশুরাও একে অপরকে নানা অপ্রীতিকর কথা বলে।’। তবে রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত এই অঙ্গরাজ্যে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও নীতিগত পদক্ষেপ যেভাবে বেড়েছে, তা তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কখনো কেউ সরকারে মুসলিম আইন চাপিয়ে দেয়নি।’। রেহাই পাচ্ছেন না রিপাবলিকান মুসলিমরাও। সংগঠনটির অভিযোগ, অ্যাবটের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানপ্রদত্ত বাক্‌স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের পরিপন্থি। এখানে কোনো একটি জাতিগোষ্ঠীর একক আধিপত্য নেই। কারণ এখানকার বড় একটি জনগোষ্ঠী আরবি ভাষায় কথা বলে না।’।

সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও পারিবারিক মানসিক চাপ

মঙ্গলবারের (৩ নভেম্বর) ভোটের কয়েক দিন আগে হিউস্টনের একটি ইসলামিক সেন্টারে পরিবারের সঙ্গে ‘ফল ফেস্ট’ নামের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন আইনজীবী সামির নাজজাম। ৪৫ বছর বয়সি এই আইনজীবী জানান, রাজনীতিতে চলমান মুসলিমবিদ্বেষের ক্ষতিকর প্রভাব তিনি সবচেয়ে বেশি অনুভব করেন নিজের সন্তানদের মাধ্যমে। তার মতে, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারেন, কিন্তু শিশুরা একই স্কুলে পড়াশোনা করায় বিদ্বেষপূর্ণ রাজনীতির কারণে সহপাঠীদের কাছ থেকে বুলিং বা সামাজিক বৈষম্যের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। তাদের পরিবারের কেউ কেউ নির্দিষ্ট কিছু সংবাদমাধ্যম দেখে। তিনি আরও বলেন, ‘আমার একটি সন্তান আছে। আমি চাই না আমার সন্তানকেও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হোক।’।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ৪২ বছর বয়সি চিকিৎসক মারিয়াম আহমেদ। তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, পরিস্থিতি এখন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। গত দুই বছরে এমনও ভেবেছি, যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত কি না।’ একটি সন্তানের জননী এই চিকিৎসক আরও জানান, তিনি চান না তার সন্তানকে সমাজে সন্ত্রাসী হিসেবে দেখা হোক, কারণ তিনি নিজেও ইতোমধ্যে এই ধরনের অপমানজনক ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।

ভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক জবাব দেওয়ার উদ্যোগ

টেক্সাসের মোট জনসংখ্যার দুই শতাংশেরও কম মুসলিম হলেও এবার ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে রাজনৈতিকভাবে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিতে চায় সম্প্রদায়টি। হিউস্টনের ৩০টির বেশি মসজিদের তত্ত্বাবধানকারী সংগঠন ‘ইসলামিক সোসাইটি অব গ্রেটার হিউস্টন’-এর সভাপতি এমরান গাজী বলেন, ‘মুসলিমদের সব জায়গায় কোণঠাসা করা হচ্ছে।’ তিনি জানান, তাদের সংগঠনটি এবার ব্যাপকভাবে ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এমনকি প্রতি শুক্রবারের জুমার নামাজের খুতবায় ধর্মীয় নেতারা মুসল্লিদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

এমরান গাজী উল্লেখ করেন, প্রতিটি মুসলিম ভোটারকে নিজেদের বিবেক অনুযায়ী ভোট দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, মুসলিমদের বিরুদ্ধে কোনো নীতি বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তারা যেন এই সম্প্রদায়ের মতামত ও স্বার্থ বিবেচনায় নেন।’ তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হিউস্টনের এক মুসলিম বাসিন্দা আল জাজিরাকে বলেন, ‘পরিস্থিতি পরিবর্তনের একমাত্র উপায় হলো ভোট দেওয়া। তবে অনেকে হতাশ হয়ে নীরব থাকাকেই শ্রেয় মনে করছেন।’ কংগ্রেসে এই জোটের সদস্যসংখ্যা বেড়ে ৬৮ জনে দাঁড়িয়েছে।

‘শরিয়াহ আইন’ কেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রচারণা

টেক্সাসের রাজনৈতিক মাঠে মুসলিমদের ভয় দেখানোর জন্য ‘শরিয়াহ আইন’ ইস্যু ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট এবং রাজ্য রিপাবলিকান পার্টির নীতিতে বারবার এ প্রসঙ্গটি আনা হচ্ছে। গত মাসে ডালাসে অনুষ্ঠিত রিপাবলিকান মিডটার্ম কনভেনশনে গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট ঘোষণা করেন, ‘আমরা ওয়াশিংটন ডিসির জন্য অপেক্ষা করছি না। টেক্সাসে কখনোই শরিয়াহ আইন চালু হতে দেওয়া হবে না।’ একই অনুষ্ঠানে রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ দাবি করেন, ‘শরিয়াহ আইন মৌলিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি বন্ধ করতে হবে।’ এতে শরিয়াহ আইনের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি শাস্তি, সরকারি চাকরি, সামরিক বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে কাজের অযোগ্য ঘোষণা, নাগরিকত্ব বাতিল এবং দেশ থেকে বহিষ্কারের মতো পদক্ষেপের কথা বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর টেক্সাসে মুসলিমদের জন্য বিশেষ আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং স্বেচ্ছায় ইসলামি সালিশ পরিচালনাকারী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম। রাজ্যটিতে সংগঠনটির কার্যক্রম বন্ধ করতে আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তিনি।

এর আগে গত জুনে টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টি ‘ডোন্ট শরিয়াহ মাই টেক্সাস’ শিরোনামে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব গ্রহণ করে। গত মার্চে টেক্সাসের আইনপ্রণেতারা ‘শরিয়াহ-ফ্রি টেক্সাস ককাস’ নামে একটি জোট গঠন করেন, যা ১৫০ সদস্যের রাজ্য আইনসভায় ইতোমধ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এ ছাড়া টেক্সাসের দুই রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য চিপ রয় ও কিথ সেলফ জাতীয় পরিষদে ‘শরিয়াহ-ফ্রি আমেরিকা ককাস’ নামে পৃথক একটি জোট গঠন করেছেন। ১৫০ সদস্যের রাজ্য আইনসভায় ইতোমধ্যে এই জোটে ৩৮ জন সদস্য যুক্ত হয়েছেন।

বাস্তবতার অসঙ্গতি ও শিক্ষা পাঠ্যক্রম বিতর্ক

মানবাধিকারকর্মী ও হিউস্টনের বাসিন্দাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে কোথাও কখনোই শরিয়াহ আইন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, তাই রাজনীতিবিদদের এই ধরনের প্রচারণা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সম্প্রতি হিউস্টনে বসবাস শুরু করা ৩৩ বছর বয়সি চিকিৎসক সারাহ দাব্বাস বলেন, ‘বাস্তব জীবনে শরিয়াহ আইন নিয়ে প্রচারণায় যা বলা হচ্ছে, মানুষ আসলে সেভাবে চলে না। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে কোনো পরিবর্তন আনতে পারি না এবং তা করতেও চাই না; আমরা শুধু নিজেদের ধর্মীয় রীতিনীতি ব্যক্তিগতভাবে পালন করি।’ সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার এ ধরনের তকমা দিয়ে থাকে।

ইসলামবিদ্বেষ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর দাবি, রাজনীতিবিদরা বিচ্ছিন্ন কিছু ধর্মীয় উদ্যোগকে বড় করে দেখান।

যেমন ২০১২ সালে ডালাসে গঠিত এক স্বেচ্ছামূলক মধ্যস্থতা প্যানেল নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, যদিও খ্রিষ্টান ও ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যেও এ ধরনের সালিশব্যবস্থা মার্কিন আইনি কাঠামোর অধীনে বৈধভাবে চালু রয়েছে। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ইসলামবিদ্বেষ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘দ্য ব্রিজ ইনিশিয়েটিভ’ গত ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে জানায়, টেক্সাসের রাজনীতিবিদরা মুসলিমদের নাগরিক অধিকার, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও সামাজিক অংশগ্রহণকে একটি পরিকল্পিত হুমকি হিসেবে চিত্রায়িত করছেন। অন্যদিকে টেক্সাস স্টেট এডুকেশন বোর্ড উচ্চমাধ্যমিক পাঠ্যক্রমে ‘চরমপন্থি ইসলাম’ ধারণাকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দিয়েছে এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে বলে তীব্র সমালোচনা উঠেছে।

রিপাবলিকান মুসলিম ও প্রাক-নির্বাচনী আইনি সংঘাত

টেক্সাসের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শুধু ডেমোক্র্যাট বা সাধারণ নাগরিক নন, বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন রিপাবলিকান পার্টির সঙ্গে যুক্ত মুসলিম নেতারাও। গত জুনে অনুষ্ঠিত টেক্সাস রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনে এক অনুষ্ঠানে মুসলিম রিপাবলিকান নেতার পোশাক পরা স্ত্রীকে হেনস্থা করা হয় এবং নিরাপত্তা কর্মীরা তাকে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগে বাধ্য করেন। সম্মেলনের অন্য এক আলোচনায় রাজ্যের এক সিনেটর দাবি করেন, শরিয়াহ আইন অনুযায়ী মুসলিমদের মিথ্যা বলতে হয়। এর ফলে হেনস্থার শিকার হন দলীয় প্রতিনিধি তারেক হোসেনের ছেলেও, যিনি ২০০০-এর দশকে কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশন্সের (কেয়ার) ডালাস শাখার বোর্ডে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তারেক হোসেন ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনসের (কেয়ার) হিউস্টন কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। টেক্সাস ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক ঘটনায় দলটির বিদায়ী চেয়ারম্যান আব্রাহাম জর্জ দুই মুসলিম প্রতিনিধিকে দল ছেড়ে চলে যেতে বলেন।

রাজনৈতিক লড়াই তীব্র হওয়ায় ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোজোসার চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা গভর্নর অ্যাবট মানবাধিকার সংস্থা ‘কেয়ার টেক্সাস’-কে একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রয়াস নেন। একইভাবে ডেমোক্র্যাট জেমস টালারিকোর প্রতিদ্বন্দ্বী টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটন কেয়ারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেন। এর জবাবে কেয়ার টেক্সাস গভর্নর অ্যাবট ও অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করে অভিযোগ করেছে যে, তাদের রাজনৈতিক পদক্ষেপ মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে প্রদত্ত নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন। সম্মেলনে উপস্থিত এক মুসলিম রিপাবলিকান নাম গোপন রাখার শর্তে জানান, বহু বছর ধরে দলের ব্যবসায়িক নীতির সমর্থনে কাজ করলেও এই ধরনের প্রকাশ্য বৈষম্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কোয়ালিশন ফর পিস, রিলিফ অ্যান্ড ইকুইটিতে কাজ করা সানিয়া রহিম বলেন, হিউস্টনসহ টেক্সাসের মুসলিম সম্প্রদায় জাতিগত ও ভাষাগত দিক থেকে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়।