তিন ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ একই রকম কেন? আলোকচিত্রীর শৈলী নিয়ে বিতর্ক

Published: November 2, 2026, 4:20 am

নভেম্বর মাসের সংখ্যাকে কেন্দ্র করে ফ্যাশন জগতের জনপ্রিয় তিনটি ম্যাগাজিন—আমেরিকার ‘ভোগ’, ‘এল’ এবং ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ কাছাকাছি সময়ে তাদের প্রচ্ছদ প্রকাশ করেছে। ২০২৬ সালের নভেম্বর সংখ্যার জন্য কাছাকাছি সময়ে প্রচ্ছদ প্রকাশ করেছে আমেরিকান ‘ভোগ’, ‘এল’ ও ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ ম্যাগাজিন। ‘ভোগ’–এর প্রচ্ছদে অভিনেত্রী জেনা ওর্তেগা, ‘এল’–এর প্রচ্ছদে অভিনেত্রী ও মডেল হান্টার শেফার এবং ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ ম্যাগাজিনের। প্রথমে ১৫ অক্টোবর জিজি হাদিদের ডিজিটাল প্রচ্ছদ প্রকাশ করে ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ ম্যাগাজিন। ২২ অক্টোবর ‘ভোগ’ প্রকাশ করে জেনা ওর্তেগার প্রচ্ছদ। ৭ মাসে ৩৭ কেজি ওজন কমিয়ে র‍্যাম্পে ফিরেছেন মডেল মাশিয়াত, কীভাবে সম্ভব করলেন।

এই প্রচ্ছদগুলোতে উঠে এসেছেন জেনা ওর্তেগা, হান্টার শেফার এবং জিজি হাদিদের মতো জনপ্রিয় তারকারা।

তবে এই প্রচ্ছদগুলো প্রকাশের পরপরই ফ্যাশন মহলে তীব্র কৌতূহল ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, কারণ তিনটি প্রচ্ছদের ছবিই তুলেছেন হাঙ্গেরির ফ্যাশন আলোকচিত্রী সিলভেস্তার মাকো। মুখে হালকা মেকআপ, ত্বকে দৃশ্যমান ছোট ছোট বাদামি ছোপ বা ফ্রেকলস।

অনেকের মতে, ছবিগুলোর মধ্যে বিস্ময়কর মিল রয়েছে, যা থেকে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি আলোকচিত্রীর নিজস্ব শৈলীর প্রভাব, নাকি নতুন ভাবনার অভাব?

ফ্যাশন জগতে সিলভেস্তার মাকোর কাজ সাধারণত ‘পেইন্টারলি অ্যাসথেটিক’ বা চিত্রকলার মতো শৈলীর জন্য পরিচিত। তার ছবিতে বাস্তব দৃশ্যকে ক্যামেরায় এমনভাবে ধারণ করা হয়, যা দেখে মনে হয় কোনো শিল্পীর রংতুলিতে আঁকা একটি ধ্রুপদি চিত্রকর্ম। রেনেসাঁ যুগের আলোকসজ্জা, গভীরতা এবং নাটকীয়তা তার কাজের মূল বৈশিষ্ট্য। তিনি ডিজিটাল এডিটিংয়ের চেয়ে বাস্তব সেট ও উপকরণ ব্যবহারে বেশি আগ্রহী, যা তার ছবিতে এক ধরনের পরাবাস্তব আবহ তৈরি করে। ইউরোপে চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতক পর্যন্ত বিস্তৃত রেনেসাঁ যুগের চিত্রকলায় মানুষের অবয়ব, পোশাক, আলো-ছায়া ও দৃশ্যের গভীরতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। সঙ্গে ব্যাগ ও বোনা কাপড়ের তৈরি দুটি ইঁদুর আকৃতির খেলনা। ছবিটি দেখলে মনে হতে পারে, কোনো ছোট মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন জিজি।

‘ভোগ’ ম্যাগাজিনের নভেম্বর সংখ্যার প্রচ্ছদে দেখা গেছে ২৪ বছর বয়সী অভিনেত্রী জেনা ওর্তেগাকে।

ডিওরের পোশাকে থাকা ওর্তেগার চেহারা ও পটভূমি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে তা প্রাচীন কোনো তৈলচিত্রের চরিত্র মনে হয়। এ ধরনের ছবিতে আলোছায়া, রং, পোশাক, পটভূমি ও মডেলের ভঙ্গি এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে পুরো দৃশ্যটি চিত্রকর্মের মতো দেখায়। সাদা পোশাক, বেগুনি পটভূমি আর নাটকীয় সাজে তাঁকে যেন কোনো পুরোনো চিত্রকর্মের চরিত্র মনে হয়। পুরো ছবিতে একধরনের কোমল অথচ নাটকীয় সৌন্দর্য। পটভূমিতে বাক্সের মতো সাজানো ঘর, পাশে কাঠের টুল।

ছবির গভীরতা তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ‘ট্রম্প লয়েল’ নামক এক প্রাচীন কৌশল।

অন্যদিকে, ‘এল’ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে ২৮ বছর বয়সী হান্টার শেফারকে দেখা গেছে অন্ধকারাচ্ছন্ন পটভূমি ও স্থির দৃষ্টির অভিব্যক্তিতে, যা একটি ক্লাসিক প্রতিকৃতির আবহ তৈরি করেছে। ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর ডিজিটাল প্রচ্ছদে জিজি হাদিদকে দেখা গেছে নীল রঙের পালকসজ্জিত পোশাকে, যেখানে ঘরোয়া সেটের ব্যবহারে বাস্তব ও কল্পনার এক অনন্য সংমিশ্রণ ঘটেছে। পোশাকের ভাস্কর্যসুলভ গড়ন, মলিন রং ও সাজানো পটভূমি ছবিটিকে বাস্তব আর কল্পনার মাঝামাঝি কোথাও নিয়ে গেছে।

প্রচ্ছদগুলো এত অল্প সময়ের ব্যবধানে একই আলোকচিত্রীর এমন সাদৃশ্যপূর্ণ কাজ দেখে অনেকেই হতবাক। পেজ সিক্স-এর বরাতে জানা গেছে, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির একটি সূত্রের মতে, আলোকচিত্রীর উচিত ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যাগাজিনগুলোর সম্পাদকীয় দলকে আগে থেকেই জানানো যে তিনি একই ধরনের শৈলী ব্যবহার করছেন।

তবে এই সমালোচনাকে পুরোপুরি একপাক্ষিক হিসেবে মানতে নারাজ অনেকে। জিজি হাদিদের ফটোশুটের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, তাঁদের কাজের পরিকল্পনা হয়েছিল মার্চের দিকে এবং জুলাই মাসে ছবিগুলো তোলা হয়। ওই সূত্রের দাবি, প্রচ্ছদগুলোর মিল কোনো কপি করা নয়, বরং এটি আলোকচিত্রী সিলভেস্তার মাকোর নিজস্ব স্বতন্ত্র শৈলীরই প্রতিফলন, যা তার আগের কাজগুলোতেও লক্ষ্য করা গেছে। এইচএসসি পাস করে ঝালমুড়ির ব্যবসা, এখন মাসে আয় এক লাখ টাকা।

ফ্যাশন দুনিয়ায় এই আলোচনার সূত্র ধরে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে ম্যাগাজিনগুলোর কাজের ধরন নিয়ে। অতীতে নামী ম্যাগাজিনগুলো নির্দিষ্ট কিছু আলোকচিত্রীর সাথে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করত। কিন্তু বর্তমানে বাজেট সংকট এবং কাজের ধরনের পরিবর্তনের ফলে অনেক ম্যাগাজিনই একই সময়ে একই ফটোগ্রাফারকে নিয়োগ দিচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন প্রকাশনায় একজন আলোকচিত্রীর একই ধরনের ছাপ বারবার দেখা যাচ্ছে। এখনকার বিতর্কটি কেবল সিলভেস্তার মাকোকে নিয়ে নয়, বরং ফ্যাশন ফটোগ্রাফির সেই চিরাচরিত শৈলী কতবার পুনরাবৃত্তি করা যায়, তা নিয়ে নতুন করে ভাববার সময় এসেছে।