বরগুনায় ভাঙন রোধে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি

বরগুনার পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদের ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জেলার প্রায় সাড়ে ৭২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই দুর্যোগের কবলে পড়ে ৩০ হাজার পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ও জীবন-জীবিকা নিয়ে দিশেহারা। এক সময়ের স্বচ্ছল গৃহস্থরা এখন বারবার ভাঙনের মুখে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে অন্যের জমিতে আশ্রয় নিচ্ছেন। উপকূলে নদীভাঙন নতুন কোনো ঘটনা না হলেও সরকারি দীর্ঘসূত্রতা ও উদাসীনতা পরিস্থিতিকে ক্রমশ জটিল করে তুলছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বরগুনার পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদের গ্রাসে জেলার সাড়ে ৭২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের করুণ দশার চিত্র। একসময়ের সচ্ছল গৃহস্থের বিঘা বিঘা জমি আর বসতভিটা চলে যাচ্ছে বিষখালী নদীতে। বরগুনার নদ-নদীঘেরা উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার মানুষের জীবনসংগ্রামের এক করুণ বাস্তবতা এটি।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের প্রভাবে পাথরঘাটার বলেশ্বর নদতীরবর্তী বেড়িবাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। অথচ দীর্ঘ দুই দশকেও সেখানে কোনো মজবুত ও টেকসই সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) প্রতিবারই স্রোতের তোড়ে তীর ভাঙার পর জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক দায়িত্ব সারে। কিন্তু ৮৮ বছরের পুরোনো কালিকাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব সংকটই প্রমাণ করে যে, এই অস্থায়ী ব্যবস্থা বিধ্বংসী ভাঙন ঠেকাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। এই সাময়িক সমাধান দিয়ে যে বিধ্বংসী নদীভাঙন ঠেকানো যায় না, ৮৮ বছরের পুরোনো কালিকাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান অস্তিত্বসংকটই তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, বরগুনার ছয়টি উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ সাড়ে ৭২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সিসি ব্লকের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে রক্ষার জন্য প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। অনেকেই এই অংকটিকে বড় মনে করতে পারেন, তবে নদীর পেটে বিলীন হওয়া কৃষিজমি, বসতভিটা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির তুলনায় এই অর্থ বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি। স্থায়ী বাঁধের অভাবে প্রতিবছর নদীভাঙনজনিত শরণার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, যা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। বাজেটের হিসাবটি বড় মনে হতে পারে, তবে নদীর পেটে তিলে তিলে বিলীন হয়ে যাওয়া হাজার হাজার একর কৃষিজমি, বসতভিটা, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সর্বস্ব হারানো মানুষের মানবিক ও অর্থনৈতিক ট্র্যাজেডির তুলনায় এই বিনিয়োগ মোটেও বেশি নয়। প্রতিবছর স্থায়ী বাঁধের অভাবে হাজার হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে নদীভাঙনজনিত শরণার্থীতে পরিণত হচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্য কাটিয়ে দ্রুততম সময়ে বরগুনার ভাঙনকবলিত তীরগুলোতে সিসি ব্লকের মাধ্যমে স্থায়ী ও টেকসই প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ নির্মাণ করা হোক, এটাই আজকের সময়ের জোরালো দাবি।

উপকূলীয় মানুষকে বারবার নিঃস্ব হওয়া থেকে রক্ষা করতে জিও ব্যাগের মতো গতানুগতিক রক্ষণাবেক্ষণের মানসিকতা থেকে সরে আসতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবিত সুরক্ষা প্রকল্পের দ্রুত অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ সময়ের দাবি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করে উপকূলবাসীর জীবন রক্ষায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন অপরিহার্য। পাউবোর পক্ষ থেকে স্থায়ী সুরক্ষার যে সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রস্তাব ঢাকায় পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে, নীতিনির্ধারকদের উচিত সেটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত অনুমোদন ও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা।