নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া গ্রামে চলছে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
১৫ অক্টোবর রাতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারান স্থানীয় সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। পরনে লাল গেঞ্জি আর নীল রঙের হাফপ্যান্ট। বাড়িতে অপরিচিত মানুষ এসেছেন, তাতে তার কোনো সংকোচ নেই। উঠানজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নানা রঙের খেলনা। বাড়িতে অতিথি আসায় পানি, চা ও বিস্কুট এনে দিলেন তিনি।
শ্বশুরবাড়ির কাছেই তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। এই শোকের মাঝেও বাড়ির সামনে উড়ছে বেলুন, যা লুৎফুজ্জামানের চার বছর বয়সী মেয়ে মুনতাহা জামান প্রান্তি ও দেড় বছর বয়সী ছেলে আয়ান ফকির সাফওয়ানের জন্য শেষ উপহার হিসেবে রয়ে গেছে। মুনতাহা এখনো অবুঝ, বাবার অনুপস্থিতিকে সে আকাশের সঙ্গে তুলনা করে বলছে, ‘বাবা স্কাই হয়ে গেছেন বা আল্লাহর কাছে চলে গেছেন।’ হাতের একটি আঙুল উঁচিয়ে বলল, ‘আমার বাবা স্কাই হয়ে গেছে।’। একটু পরেই নেমে বসছে খেলনাগুলোর পাশে। উঠানের এক পাশে মাটিতে গাছের ছায়া পড়েছে। মুনতাহার ছোট্ট পৃথিবীজুড়ে এখনো সেসব নিয়েই ব্যস্ততা। তার এই ব্যস্ততা দেখে বোঝার উপায় নেই, মাত্র কয়েক দিন আগে কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেছে এই পরিবারে। মুনতাহা তখন মায়ের পাশে বসে নির্বাক দৃষ্টিতে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। নিজের ছোট্ট গালটি মায়ের গালের সঙ্গে লাগিয়ে রইল। মায়ের কান্নার কারণ কতটা বুঝতে পারছে, তা জানা নেই। বাড়ির সামনে উড়তে থাকা বেলুন দুটি দেখিয়ে জানাচ্ছে, বাবা কিনে দিয়েছেন।
সাংবাদিক আলিফের অকাল প্রয়াণে তার স্ত্রী খাদিজা আক্তার দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। খাদিজা গারো সম্প্রদায়ের নারী, যিনি বিয়ের আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তিনি শোকে পাথর। ছোট মুনতাহা মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে বাবা যে চিরতরে হারিয়ে গেছেন, তা বোঝার বয়স তার হয়নি। ছোট ভাই আয়ান এখনো বিছানায়, সে জানেই না তার জীবন থেকে কতটা বড় অবলম্বন হারিয়ে গেছে। গত শুক্রবার দুপুরে আলিফের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, টিনের ঘরের সামনের উঠানে খেলছে মুনতাহা। একবার মোটরসাইকেলে চড়ে দুই হাতে হাতল ধরে দোল খাচ্ছে মুনতাহা। আলিফের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক থেকে তাঁদের বিয়ে হয়। স্বামীর কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন এই নারী।
পরিবারটির আর্থিক সংকট দীর্ঘদিনের। সাংবাদিক লুৎফুজ্জামানের সামান্য আয়ে সংসার চালানো কঠিন ছিল। এই টানাপোড়েন থেকে মুক্তি পেতে তারা ঢাকায় গিয়ে নতুন জীবন গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। খাদিজা নার্সিং বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন, তাই রাজধানীতে গিয়ে চাকরির মাধ্যমে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন ছিল তাদের। আগামী নভেম্বর মাসে তাদের ঢাকা যাওয়ার কথা ছিল। এই প্রস্তুতির জন্য লুৎফুজ্জামানের শাশুড়ি ৪০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলেন।
আজ সেই ঋণের ৪০ হাজার টাকাই পরিবারটির বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। যে স্বপ্ন নিয়ে তারা ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, লুৎফুজ্জামানের মৃত্যুতে তা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই টাকা শেষ হলে তারা কীভাবে সন্তানদের খাবার, চিকিৎসা ও পড়াশোনার খরচ জোগাবেন। দুই সন্তানের ভবিষ্যতের দায়িত্ব এখন সম্পূর্ণ খাদিজার কাঁধে। মায়ের সঙ্গে আপ্যায়নের দায়িত্ব যেন নিয়েছে ছোট্ট মুনতাহাও।
সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ তার মেয়ের ছোট ছোট আবদার পরম মমতায় পূরণ করতেন। মেয়ের পছন্দের চিকেন ফ্রাই থেকে শুরু করে খেলনা পর্যন্ত—সবই ছিল তার আনন্দের উৎস। বাবার সেই আদরের স্মৃতি এখনো খেলনা ও বেলুনগুলোর মাঝে খুঁজে ফেরে মুনতাহা। বাড়ির আঙিনায় সাজানো টেডি বিয়ার, প্লাস্টিকের সিংহ আর পুতুলগুলো এখন তার একাকী খেলার সঙ্গী। সে জানে না, যে মানুষটি তাকে ভালোবেসে এসব কিনে দিয়েছিলেন, তিনি আর কখনো ফিরবেন না। একটি পুতুলের মাথায় পরম যত্নে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। খেলনা আর খেলাধুলার এই জগতে বাবার স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। কোনো দিন ভালো করে পড়াশোনা করলে বাবাকে চিকেন ফ্রাই আনতে বলত।
সীমান্ত অঞ্চলে অপরাধের অনুসন্ধানে কাজ করার কারণেই হয়তো তিনি সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন। সেই পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই অকালে ঝরে গেল একটি প্রাণ। লুৎফুজ্জামানের মৃত্যুতে একদিকে যেমন শোকাচ্ছন্ন তার পরিবার, অন্যদিকে তার সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা স্থানীয় মহলেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। লুৎফুজ্জামানের অভাব তার স্ত্রী খাদিজাকে যে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, তার উত্তরণ কোথায়, তা নিয়ে এখন পরিবারের স্বজনরা চরম উদ্বেগে রয়েছেন।








