জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবি তুলে করা একটি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মোট ৮৪ জন আসামিকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) উক্যমং রাখাইন গত ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে এই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদীর অভিযোগের প্রাথমিক কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। নূর হোসেন নামের যে যুবক মামলাটি দায়ের করেছিলেন, তিনি বাস্তবে আহত হননি। মামলার সঙ্গে তিনি চিকিৎসাসংক্রান্ত যেসব কাগজ জমা দিয়েছিলেন, সেগুলো জাল বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এই ভুয়া নথিপত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার বিষয়টি প্রতিবেদনের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মূল রেজিস্টার যাচাই করে দেখতে পান যে, নূর হোসেন নামে কোনো ব্যক্তি ঘটনার দিন সেখানে চিকিৎসা নেননি।
প্রতিবেদনে দুটি বড় অসংগতি উঠে এসেছে: প্রথমত, হাসপাতালের চিকিৎসকদের হাতে লেখা ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার নিয়ম থাকলেও বাদীর দাখিল করা কাগজটি ছিল কম্পিউটারে টাইপ করা।
দ্বিতীয়ত, ওই ব্যবস্থাপত্রে ব্যবহৃত ক্যাশ মেমো নম্বরটি অন্য একজন রোগী আব্দুস সাত্তারের এবং পেশেন্ট আইডি নম্বরটি জুয়েল নামের আরেক ব্যক্তির নামে বরাদ্দ ছিল। দ্বিতীয়ত, ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখ করা ক্যাশ মেমো নম্বর যাচাই করে দেখা যায়, সেটি আব্দুস সাত্তার নামের ৫৪ বছর বয়সী এক রোগীর নামে বরাদ্দ ছিল। একইভাবে চিকিৎসাপত্রে উল্লেখ করা পেশেন্ট আইডি নম্বরটি ছিল জুয়েল নামের ৩২ বছর বয়সী অন্য এক ব্যক্তির।
এছাড়াও জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের আনুষ্ঠানিক সরকারি তালিকায় নূর হোসেনের নাম নেই।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর নূর হোসেন বাদী হয়ে শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর থানায় হত্যাচেষ্টার মামলাটি দায়ের করেন। তার এজাহারে দাবি করা হয়েছিল, ৪ আগস্ট বিকালে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ময়ূর ভিলা এলাকায় হামলার শিকার হওয়ার সময় তিনি পিঠে ছয়টি ও দুই পায়ে তিনটিসহ মোট নয়টি গুলিবিদ্ধ হন। তিনি আরও দাবি করেছিলেন, আহত অবস্থায় হাসপাতালে গেলেও আসামিদের ভয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে চিকিৎসা দেয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পিঠে ছয়টি, বাঁ পায়ের হাঁটুর ওপরে দুটি এবং ডান পায়ের হাঁটুর পাশে একটি গুলি লাগে। পরবর্তী সময়ে হামলাকারীরা তাকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, মামলার পর অন্য কোনো মামলায় কারাগারে থাকা আটজন আসামিকে এ ঘটনায় শ্যোন অ্যারেস্ট বা গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল। তবে এই মামলার এজাহারের ভিত্তিতে নতুন করে কাউকে সরাসরি আটক করা হয়নি। শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদের ছাড়াও অব্যাহতি পাওয়া উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু, ছাত্রলীগ নেতা রিয়াজ মাহমুদ, সলিম উল্লাহ পাটোয়ারী, মিলন হোসেন, এবং মহিলা লীগ নেত্রী ইশরাত জাহান তামান্না ও স্বপ্না খন্দকার।
বিষয়টি সম্প্রতি আদালতের নজরে এলে ম্যাজিস্ট্রেট নথিপত্র পর্যালোচনা করেন এবং বাদীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারির আদেশ দেন। আগামী ১ ডিসেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগে বাদীর বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে সরাসরি পদক্ষেপ না নেওয়া হলেও, এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাদী বা অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্ণ এখতিয়ার আদালতের রয়েছে।








