১৩ ঘণ্টায় ৬২ লাখ টাকা সহায়তা, মিনহার ক্যানসার চিকিৎসায় অভূতপূর্ব সাড়া

Published: November 4, 2026, 2:45 am

মাত্র ১১ মাস বয়সে রক্তের ক্যানসার ধরা পড়ে ১৪ মাস বয়সী শিশু মিনহা রহমান রিদার। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহায়তার আবেদন জানান তাঁর পরিবার। এর পরপরই দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। অনলাইনে পোস্ট দেওয়ার মাত্র ১৩ ঘণ্টার মধ্যে মিনহার চিকিৎসা তহবিলে যুক্ত হয় ৬২ লাখ ৪১ হাজার ৮৩৮ টাকা। খরচের তুলনায় পর্যাপ্ত অর্থ উঠে আসায় দ্রুতই সহায়তার আবেদন বন্ধ করে দেন তাঁর পরিবার। মিনহা খাচ্ছিল না, ওজন বাড়ছে না—এমন কিছু সমস্যা হতে থাকে। প্রথমে অন্য জায়গায় মিনহার পরীক্ষা করানো হয়েছিল।

মিনহার মামা শাহাদাত জামান সৈকত একটি ওয়েবসাইট (https://saveminha.xyz/) তৈরি করে ফেসবুকে প্রথম সহায়তার আবেদন জানান। সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে অসংখ্য মানুষ অর্থ পাঠাতে শুরু করেন। বিপুল সাড়া পেয়ে গত ৮ আগস্ট শাহাদাত ফেসবুকে লেখেন, ‘মিনহা পাখির জন্য একটা সমুদ্র চেয়েছিলাম আমি। ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই সেই সমুদ্রের জন্ম হয়ে গেছে। মাত্র ১৩ ঘণ্টায় আমরা ৬২ লাখ ৪১ হাজার ৮৩৮ টাকা তুলে ফেলেছি।’ তিনি জানান, সহায়তার পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকায় এবং মানুষের অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া অনুচিত ভেবে তিনি ১৩ ঘণ্টা পর নতুন পোস্ট দিয়ে আর টাকা না পাঠাতে অনুরোধ জানান। মিনহার মামা শাহাদাত বলেন, মিনহার চিকিৎসায় একটুও সময় নষ্ট করা হয়নি। শাহাদাত বলেন, ‘যে হারে মানুষ টাকা পাঠাতে থাকেন, তা দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যাই। ফেসবুকে তো অনেকেই সাহায্য চেয়ে আবেদন করেন, সবাই তো মিনহার মতো সহায়তা পান না, এ প্রশ্নের উত্তরে শাহাদাত বলেন, এটা মিনহার ‘গুড লাক’। তারপরই শাহাদাত নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মাঠে নামেন।

ক্যানসারে আক্রান্ত মিনহার চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হচ্ছে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে। তবে প্রাথমিক চিকিৎসার আগে থেকেই বিভিন্ন বাধা ও আর্থিক অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হতে হয় পরিবারটিকে। শাহাদাত জামান জানান, ক্যানসার শনাক্তের পর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হলেও প্রথম দিকে প্রয়োজনীয় অর্থ হাতে ছিল না। তাই শুরুতে মিরপুরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করে মিনহার চিকিৎসা শুরু করা হয়। পরবর্তীতে ইনফেকশন বা সংক্রমণ এড়ানোর চিকিৎসাগত নিরাপত্তার কথা ভেবে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। এখন বেশির ভাগ সময়ই হাসপাতালে থাকতে হয় বা বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে যেতে হয়। গত মঙ্গলবার বনশ্রীর এ বাসায় বসেই কথা হয় মিনহার মা ও মামার সঙ্গে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক প্রটোকল মেনে মিনহার চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসার গতি পর্যবেক্ষণ করতে ও পরামর্শ যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে মিনহাকে ভারতের একটি উন্নত ক্যানসার হাসপাতালেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও নিশ্চিত করেছেন যে বাংলাদেশে পরিচালিত চিকিৎসা সঠিক পথেই এগোচ্ছে। তবে এই দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়া বেশ ব্যয়বহুল।

মিনহার পরিবার জানায়, ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত চিকিৎসা বাবদ প্রায় ৪০ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। চিকিৎসকদের মতে, সম্পূর্ণ সুস্থ হতে মিনহাকে টানা অন্তত চার বছর চিকিৎসাধীন থাকতে হবে। আগামী দিনগুলোতে মোট কত টাকা খরচ হবে, সে বিষয়ে পরিবারের স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। প্রতি পদক্ষেপে নতুন নতুন চিকিৎসার খরচ যোগ হচ্ছে। চিকিৎসার অংশ হিসেবে বুধবার মিনহার বুকে ‘কেমো পোর্ট’ বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেখানে এককালীন খরচ হবে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এর আগেও একবার কেমো পোর্ট বসানো হলেও পরে তা অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। এবার পোর্ট সফলভাবে বসানোর পর পুনরায় কেমোথেরাপি শুরু করা হবে। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে কত টাকা খরচ হবে তা এখনো অজানা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারও সহায়তার আবেদনের মধ্যে মিনহার এই ঘটনা ব্যাপকভাবে সাড়া পাওয়ার পেছনে স্বচ্ছতাকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন তাঁর মামা শাহাদাত জামান সৈকত।

পেশাগতভাবে তিনি সামাজিক সংগঠন ‘মজার স্কুল’-এর কো-ফাউন্ডার এবং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী কাজের সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, সহায়তার পোস্টটি আবেগ দিয়ে লিখে দিয়েছিলেন তাঁর হবু স্ত্রী হেরা অফেলিয়া লরেন। একই সঙ্গে কানাডাপ্রবাসী আত্মীয় এহসান খানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ডোনেশন প্ল্যাটফর্ম ‘GoFundMe (Canada)’-এ আবেদন করে তোলা হয় প্রায় ৩০ লাখ টাকা। শাহাদাত বলেন, ‘অনলাইনে সহায়তার আগে মানুষ স্বচ্ছতা দেখতে চান। আমরা মিনহার জন্য একটি ডেডিকেটেড ওয়েবসাইটে নিয়মিত সব তথ্য ও খরচের হিসাব আপডেট করেছি, যা মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে সাহায্য করেছে।’

অর্থ সহায়তা পাওয়ার দিনগুলোর কথা স্মরণ করে মিনহার মা মালিহা মোবাকশ্বেরা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, চিকিৎসকেরা যখন প্রথম ক্যানসারের কথা জানান, তখন সোনার গয়না বা জমির অংশ বিক্রি করার কথা ভাবছিল পরিবার। সাধারণ মানুষ এভাবে এগিয়ে আসবে তা কল্পনাতীত ছিল। অনেকে ১০০ টাকা বা ৫০০ টাকার মতো ছোট ছোট অংকের টাকাও পাঠিয়েছেন, যা দিনশেষে বিশাল এক অঙ্কে পরিণত হয়। মালিহা বলেন, ‘মানুষ এভাবে পাশে না দাঁড়ালে মেয়ের চিকিৎসা চালানো সম্ভব হতো না। আমি চাই আমার মেয়েটা বেঁচে থাকুক, ওর মুখের হাসিটা যেন সারাজীবন ধরে রাখতে পারি।’ প্রয়োজন হলে মেয়ের জীবনের তাগিদে আবারও দেশবাসীর সহায়তা চাইবেন বলে জানান তিনি। ‘প্রথমেই মনে হয়েছে, আমার ছোট বাচ্চাটার কেন এমন হলো। এত দিন পর বাচ্চাটা হলো…এসব কথা বলতে গেলে বুক ফেটে যায়। সারাক্ষণ মেয়েকে নিয়ে চিন্তায় থাকি, কখন কী হয়ে যায়। কথাগুলো যখন বলছিলেন, তখন মালিহা মোবাকশ্বেরার দুই চোখ থেকে অঝোরে পানি ঝরছিল। কথা বলার এক পর্যায়ে মিনহার মা মালিহা মোবাকশ্বেরার মুখে একটু হাসি দেখা গেল। মালিহা এই মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। মুখে চারটি দাঁত, একটু পরপর দাঁত বের করে হাসে। ভারত ও দেশের মধ্যে চিকিৎসা করানোর পর তিনি মা হন। শিশুদের এ ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় সংক্রমণের বিষয়টিতে বারবার সতর্ক করা হয়েছে। একসময় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন এমন একটি বড় গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে মিনহার জন্য সহায়তা চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন।

মিনহার বাবা রোমান হোসেন নারায়ণগঞ্জের ভুলতায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ পদে কর্মরত। ক্যানসার ধরা পড়ার পর থেকে মালিহা তাঁর মেয়েকে নিয়ে ঢাকার বনশ্রীতে নিজের মা ও ভাইয়ের বাসায় থাকছেন। দীর্ঘ পাঁচ বছরের বন্ধ্যাত্ব ও নানা শারীরিক জটিলতা কাটিয়ে বিয়ের অনেক বছর পর মিনহার জন্ম হয়। গত বছরের ২২ আগস্ট অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া মিনহা ১১ মাস বয়স পর্যন্ত সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল। মিনহা গর্ভে থাকার সময় মালিহার থাইরয়েড, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা জটিলতা ছিল।

চলতি বছরের মে মাসে প্রথম মিনহার জ্বর আসে এবং পরবর্তীতে তা সেরেও যায়। তবে ধীরে ধীরে খাওয়া বন্ধ হওয়া ও ওজন না বাড়ার সমস্য দেখা দেয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে গলার অংশ ফুলে উঠলে ৩১ জুলাই রক্তের হোয়াইট ব্লাড সেল (ডব্লিউবিসি) পরীক্ষায় চিকিৎসকেরা ব্লাড ক্যানসার সন্দেহ করেন। এরপর ১ আগস্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার চিকিৎসা শুরু হয়।

হাসপাতালের নিয়মিত কেমোথেরাপি ও কষ্টের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মালিহা জানান, বারবার ভেইন বা রগ না পাওয়ায় ছোট বাচ্চার শরীরে ক্যানুলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। শিশুটির চিৎকারে পরিবার বিপর্যস্ত হলেও বর্তমানে সার্বিক পরিস্থিতিকে মেনে নিয়েই পথ চলছেন তারা। তবে শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও মিনহা পরিবারের সবাইকে আনন্দে রাখার চেষ্টা করে। সে এখন মা, বাবা ও মামা ডাকতে শিখেছে, ধরে ধরে হাঁটার পাশাপাশি হাসিমুখে ঘরের পরিবেশ জমজমাট রাখে। পরিবারের এখন একটাই প্রার্থনা, দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক ছোট্ট মিনহা।