দিল্লিতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ: যান চলাচলে বিধিনিষেধে বাড়বে পণ্যের দাম

Published: November 1, 2026, 11:21 am

দিল্লির বায়ুদূষণ রোধে একগুচ্ছ কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে ১ নভেম্বর থেকে আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দিল্লির বাইরে নিবন্ধিত ‘বিএস ৬’ মানদণ্ডের নিচের যেকোনো পেট্রল ও ডিজেলচালিত যানবাহনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে বাস, ট্রাক, ট্রাক্টর, ছোট গাড়ি এবং দুই বা তিন চাকার যানবাহন। দিল্লিতে চলাচলের জন্য এখন কেবল বিএস ৬ মানদণ্ডের গাড়ি কিংবা বিদ্যুৎ, সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত যানবাহনের অনুমতি রয়েছে। তবে এই কঠোর পদক্ষেপের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন। যানবাহনের ভাড়া যেমন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়বে, তেমনই বেড়ে যাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী; বিশেষ করে মাছ-মাংস-ডিম থেকে শুরু করে আলু-পেঁয়াজ-শাকসবজির দাম। শীতের আগেই বায়ুদূষণ মোকাবিলায় দিল্লির বড় ঘোষণা, চালু হচ্ছে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’। দিল্লিতে প্রবেশের অনুমতি থাকছে শুধু ‘বিএস ৬’ মানদণ্ডের গাড়ি এবং সেসব যান যেগুলো বিদ্যুৎ, সিএনজি অথবা ব্যাটারিতে চলে। ব্যাপারীদের আশঙ্কা, মান্ডিতে মালপত্র আসা ব্যাহত হলে এবং তা দিল্লি ঢুকতে না পারলে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়তে বাধ্য। যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও নিষিদ্ধের আওতায় রয়েছে নির্মাণকাজ।

পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দিল্লির পাশের রাজ্য উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা ও রাজস্থানের এনসিআর এলাকায় প্রায় ৪৮ লাখ বাস, ট্রাক ও ট্রাক্টর নথিভুক্ত রয়েছে। এ পদক্ষেপের ফলে কী হতে চলেছে—পরিবহন মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানই তা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে। ‘বিএস ১’ থেকে ‘বিএস ৪’ মানদণ্ডের ৪৮ লাখ বাস, ট্রাক, ট্রাক্টর ও অন্যান্য গাড়ি দিল্লির লাগোয়া ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রিজিয়নে (এনসিআর) নথিভুক্ত।

এসব যানবাহন নিয়মিত দিল্লিতে যাতায়াত করে, যার বড় একটি অংশ এখন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়বে। সর্বভারতীয় মোটর ট্রান্সপোর্ট কংগ্রেসের হিসাবমতে, প্রায় আড়াই লাখ পণ্যবাহী যান এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বর্তমানে দিল্লির মাছ, মাংস, ডিম, আলু, পেঁয়াজ, শাকসবজি ও দুধের বড় অংশের জোগান আসে এনসিআর এলাকার গাজিয়াবাদ বা ফরিদাবাদের মতো পাইকারি বাজার থেকে। সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই দাম বাড়ার উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব যানবাহনেই জম্মু কাশ্মীর ও হিমাচল প্রদেশ থেকে দিল্লিতে আপেল আসে। মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থান থেকে আসে পেঁয়াজ।

যানবাহন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নির্মাণকাজের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবে সেন্ট্রাল ভিস্তার মতো জরুরি সরকারি প্রকল্পগুলোতে কাজ চলবে, যেখানে ধূলিকণা নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানোর নির্দেশ রয়েছে। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি অফিসে ৫০ শতাংশ কর্মীকে বাড়ি থেকে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দিল্লি প্রবেশের চেকপোস্টগুলোতে এআই-চালিত স্বয়ংক্রিয় নম্বর প্লেট রিকগনিশন ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ৩০০ কর্মীকে তদারকির কাজে নিয়োগ করা হয়েছে এবং পেট্রলপাম্পগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, দূষণ সনদ ছাড়া কোনো যানকে জ্বালানি সরবরাহ না করতে। চেকপোস্টগুলোয় মোট ৩০০ কর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে, যাঁরা নির্দেশ মানা হচ্ছে কি না, তদারক করবেন। কিন্তু এবার তা কঠোরভাবে পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ক্যামেরা গাড়ির দূষণের মানদণ্ড চিহ্নিত করবে। তা ছাড়া প্রত্যেক জায়গাতেই ব্যারিকেড রাখা হচ্ছে। সেই সব এলাকার রাস্তা, গাছপালায় পানি স্প্রে করতে হবে, যাতে ধূলিকণা বাতাসে উড়ে ‘পিএম ২’ বৃদ্ধি করতে না পারে। পশ্চিমি হাওয়ায় ভর দিয়ে সেই ধোঁয়া দিল্লি ছেয়ে ফেলে।

রাজনৈতিক মহলে এই বিধিনিষেধ নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে। অনেকে মনে করছেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণের নামে আসলে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে বিরোধী রাজনৈতিক সমাবেশের ভিড় কমানোর চেষ্টা করা হতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এদিকে দূষণের একটি বড় কারণ হিসেবে পাঞ্জাব ও হরিয়ানার খেত পোড়ানোর প্রথা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আবার দীপাবলি ও উৎসবে প্রচুর পরিমাণে আতশবাজি পোড়ানো দূষণের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। অথচ ধর্মীয় আবেগের দোহাই দিয়ে বাজি পোড়ানো বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগই নেওয়া সম্ভব হয়নি, যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টও হতাশা প্রকাশ করেছে। এমনকি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত হতাশ হয়ে প্রশ্ন করেছেন, যে নির্দেশ কার্যকর করা যায় না, তা বলবৎ করার অর্থ কী। রাজনৈতিক মহলে এমন চর্চাও হচ্ছে, ১ নভেম্বর থেকে তিন মাসের জন্য এভাবে দূষণযুক্ত যানবাহনের দিল্লি প্রবেশ বন্ধ করে দিল্লির বিজেপি সরকার কি ১ নভেম্বর (রোববার) রামলীলা ময়দানের বিরোধী সমাবেশের ভিড় কমাতে পারবে। এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধান সমস্যা। তাঁদের দাবি, বাজি পোড়ানো দীপাবলির ধর্মীয় অঙ্গ। কারণ, জমি থেকে কাটা ফসলের গোড়া তোলা খরচ ও সময়সাপেক্ষ।

গত ২৯ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ ও বিচারপতি পি বি ভারালের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, প্রতিবছর উৎসবের আগে বাজি পোড়ানো বন্ধের নির্দেশ নিছক তাত্ত্বিক চর্চায় পরিণত হয়েছে। স্রেফ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দূষণ রোধ সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিচারপতিরা। তাঁরা পরামর্শ দিয়েছেন, জনসচেতনতা বাড়াতে বিরাট কোহলিদের মতো জনপ্রিয় ব্যক্তি বা বিনোদন জগতের তারকাদের প্রচারণায় যুক্ত করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে দেখা দিচ্ছে সংশয়ও, দূষণযুক্ত যান বন্ধের নির্দেশ ঘিরে। জনরোষের ভয়ে পুলিশ আগ্রহীও নয়।

শীতকালে দিল্লির বায়ুদূষণ বা একিউআই মাত্রার চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সাধারণত অক্টোবরের শেষ ও নভেম্বরের শুরুতে এটি ২০০ থেকে ৩৫০-এর মধ্যে থাকে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে তা বেড়ে ৩৫০ থেকে ৪০০ হয়, আর অনেক সময় ৫০০-ও স্পর্শ করে। হাজারো বিধিনিষেধের পরেও এই পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে, কারণ কার্যকর বাস্তবায়নের অভাব এবং বাজি পোড়ানোর মতো বিষয়গুলোতে প্রশাসনের ব্যর্থতা এখনো স্পষ্ট।