বেনামে কোম্পানির মালিকানা রোধে কঠোর হচ্ছে কোম্পানি আইন

Published: October 26, 2026, 4:49 am

ইন্টারন্যাশনাল ভয়েস কে টেল লিমিটেড নামক একটি আন্তর্জাতিক গেটওয়ে কোম্পানির প্রায় ১২৬ কোটি টাকার টেলিযোগাযোগ বিল বকেয়া পড়ার ঘটনাটি কোম্পানি আইনের দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসে।

কোম্পানিটির মালিকানা এমন তিন ব্যক্তির নামে হস্তান্তর দেখানো হয়েছিল, যারা বিষয়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত ছিলেন।

এদেরই একজন সাখাওয়াত হোসেন।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ হাইকোর্ট বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রকৃত মালিক খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন।

তদন্তে বেরিয়ে আসে, ঘটনার নেপথ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা।

প্রকৃত মালিক শনাক্তের সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থার অভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, যা বর্তমান আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তাকে জোরালো করেছে।

আইন সংশোধনের মূল লক্ষ্য ও প্রস্তাবনা

এই ঘটনার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর প্রায় ৪০টি ধারায় পরিবর্তন এনে সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি আইন প্রণয়নের পর সবচেয়ে বড় সংস্কার হতে যাচ্ছে। নতুন খসড়ায় কোম্পানির প্রকৃত মালিকানা প্রকাশ, ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিবন্ধন ও নথি সংরক্ষণ এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে একটি আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে চূড়ান্ত খসড়া সংসদে উত্থাপন করা হবে। এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা সম্পন্ন হয়েছে। এটিসহ ৪০টি ধারায় পরিবর্তন এনে ৩৫ বছর পর কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

প্রশাসনিক সহজীকরণ ও আইনি কাঠামো

  • বর্তমানে সংঘস্মারক সংশোধনের জন্য আদালতের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, যা কমিয়ে নিবন্ধকের অনুমোদনের ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
  • কোম্পানির উদ্দেশ্য পরিবর্তন, ব্যবসার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, নতুন ব্যবসা যুক্ত বা একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে এখন থেকে নিবন্ধক সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন।
  • নিবন্ধকের কোনো সিদ্ধান্তে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে নির্ধারিত মাশুল প্রদান সাপেক্ষে ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করা যাবে, যা আদালতকেন্দ্রিক জটিলতা হ্রাস করবে।
  • কাগজের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে রেকর্ড, নোটিশ ও চুক্তি সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা আসছে।
  • আইন অমান্যের ক্ষেত্রে জরিমানা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে; যেমন নাম পরিবর্তনের নির্দেশ অমান্য করলে বিদ্যমান ৫০০ টাকার জরিমানার স্থলে প্রতিদিন ৫ হাজার টাকা এবং দায়ী কর্মকর্তার জন্য ১০০ টাকার পরিবর্তে ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হচ্ছে।
  • বিভ্রান্তি দূর করতে সরকারি সচিব পদ থেকে আলাদা করার উদ্দেশ্যে ‘সচিব’ শব্দের পরিবর্তে ‘কোম্পানি সচিব’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

একক মালিকানা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুবিধা

একক মালিকানার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কোম্পানি কাঠামোয় আনার সুযোগ বাড়াতে ‘ওয়ান পারসন কোম্পানি’ বা ‘ওপিসি’ অন্তর্ভুক্তির বিধান রাখা হচ্ছে। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে এই ধরনের কোম্পানিকে পরবর্তীতে প্রাইভেট বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরের সুযোগ থাকবে। নামের ক্ষেত্রে পাবলিক লিমিটেডের জন্য ‘পিএলসি’, প্রাইভেট লিমিটেডের জন্য ‘লিমিটেড’ বা ‘লি.’ এবং একক মালিকানার জন্য ‘ওয়ান পারসন কোম্পানি’ বা ‘ওপিসি’ ব্যবহারের বিধান বহাল রাখা হয়েছে। যদি নিবন্ধিত হয়েই যায়, কোম্পানিকে নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেবে সরকার।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক মনে করেন, কোম্পানি আইনকে যুগোপযোগী করার বিষয়টি অনেক আগে থেকেই প্রয়োজন ছিল। তাঁর মতে, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা এই প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং আইনটি সংশোধন এখন সময়ের দাবি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের সংশোধনের অন্যতম দিক হলো কোম্পানি নিবন্ধন ও নথি সংরক্ষণের ডিজিটালাইজেশন, যা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যবসায়িক পরিবেশকে আরও গতিশীল করবে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বেনামে কোম্পানি পরিচালনা বা মালিকানা লুকানোর সুযোগ আর থাকবে না, যা দেশের করপোরেট সংস্কৃতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পাওনা পরিশোধ বা পাওনাদারকে নিরাপত্তা দেওয়ার বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময় কমানো সম্ভব হবে। তবে এবার যে গতিতে এগোচ্ছে, আইন সংশোধন হবেই।