মানিকগঞ্জে খর্বাকৃতির চার ভাই-বোনের কষ্টের জীবন

Published: October 26, 2026, 2:51 am

মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দীঘি ইউনিয়নের ভাটবাউর গ্রামে মৃত হযরত আলী ও জহুরা বেগমের পরিবারে নেমে এসেছে এক করুণ বাস্তবতা। তাঁদের আট সন্তানের মধ্যে চারজনই খর্বাকৃতির বা বেঁটে। দুই ভাই কিছুটা চলাফেরা করতে পারলেও দুই বোন দাঁড়াতেই পারেন না। প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় সব কাজ ও খাওয়ার জন্য তাঁদের পুরোপুরি অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাঁদের প্রাকৃতিক কাজও সারতে হয় অন্যের সহযোগিতায়।

পরিবারের সদস্যদের শারীরিক গঠন অনুযায়ী তালিকাটি নিম্নরূপ

  1. খর্বাকৃতির চার সন্তান হলেন মোছা. হাবিয়া (৬৪), মোছা. মেহেরজান (৫৮), ইজ্জত আলী (৫২) ও সিরাজ আলী (৪৮)।
  2. সুস্থ চার সন্তান হলেন ছবিয়া বেগম (৬১), আফেলা বেগম (৫৫), লিটন মিয়া (৪৬) ও দাপালি বেগম (৪২)।
  3. পরিবারের অভিভাবক মৃত হযরত আলী বিআইডব্লিউটিসির কর্মী ছিলেন, যিনি প্রায় ১০ বছর আগে মারা যান।

জহুরা বেগম জানান, তাঁর সন্তানরা জন্মগতভাবে এমন ছিলেন না। প্রথম সন্তান হাবিয়ার বয়স যখন সাত বছর, তখন তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। সুস্থ হওয়ার পর থেকে তাঁর হাঁটাচলায় অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। একই বয়সে অন্য তিন সন্তানের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। তখন থেকে চারজনের মধ্যে দুজন চিরতরে হাঁটার ক্ষমতা হারান। জহুরা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, গ্রামের মানুষদের নানা কটূক্তি ও ঠাট্টা তাঁদের প্রতিনিয়ত শুনতে হয়। জ্বর সেরে যাওয়ার কয়েক দিন পর হাঁটার সময় হাবিয়াকে অস্বাভাবিক মনে হয়। পরে কবিরাজের কাছে চিকিৎসা করিয়েও হাবিয়া সুস্থ হয়ে ওঠেননি।

প্রতিবন্ধী মেহেরজান বলেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে আছেন। বাড়ির বাইরে বের হওয়ার মতো সুগম কোনো রাস্তা নেই এবং হুইলচেয়ার ব্যবহারের সুবিধাও অনুপস্থিত। বর্তমানে প্রতিবন্ধী ভাতা ও জমির ফসলের আয় দিয়ে কোনোমতে তাঁদের সংসার চলছে। ইজ্জত আলী ও সিরাজ আলী বাড়ির কাছেই ভাটবাউর বাজারে সড়কের পাশে ছোট একটি পান-সিগারেটের দোকান করে অতি সামান্য উপার্জন করেন। তিনি বলেন, ‘বাড়ির বাইরে বের হইলে মাইনষে কত ঠাট্টার কথা কইছে। প্রতিবন্ধী মেহেরজান বলেন, ‘আমাগো কষ্টের জীবনের খোঁজ কেউ নেন না। হুইলচেয়ারে করে কেউ বের করবে, হেই রাস্তাও নাই। ছেলের সরকারি কোনো চাকরি হলে তাঁদের সংসারে কষ্ট কিছু ঘুচে যেত।

ইজ্জত আলীর দুই ছেলে ইয়াসির আরাফাত (২২) ও আলিফ আহম্মেদ (২০) উচ্চমাধ্যমিক পাস করলেও অভাবের কারণে বড় ছেলে আরাফাত একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ নিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, বাড়ি থেকে বের হওয়ার রাস্তা না থাকায় তাঁদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। দুই বছর আগে প্রতিবেশীদের সহায়তায় রাস্তায় সামান্য মাটি ফেলা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। রাস্তাঘাট না থাকায় প্রতিবন্ধী দুই বোনকে হাসপাতালে নিতেও সমস্যায় পড়তে হয়।

স্থানীয় সমাজসেবক আমজাদ হোসেন বলেন, পরিবারটির চার সদস্যের খর্বাকৃতির কারণে দৈনন্দিন জীবনে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এছাড়াও রাস্তা না থাকায় ওই এলাকাটির অন্তত ১০টি পরিবার অন্যের বাড়ির ওপর দিয়ে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে।

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমী নাসরিন জানান, পরিবারটির বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এদিকে, ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বন্ধুসভার সদস্যরা গত শনিবার পরিবারটির বাড়িতে গিয়ে একটি সেলাই মেশিন ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী উপহার দেন।