খুলনা মহানগর ও জেলা এলাকায় অপরাধের ধরন আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কখনো প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে, কখনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে বা জখম করে, আবার কখনো বাসায় ঢুকে গুলিবর্ষণ করে এসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এমনকি ছিনতাইয়ের মতো অপরাধেও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। অপরাধী চক্রগুলোর সদস্যরা জনবহুল এলাকাতেও প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি চালাতে দ্বিধা করছে না। এসব গোষ্ঠীর কারও কারও বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর দলের কেউ মাদক কারবার বা অন্য কোনো অপকর্মে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু তাঁদের কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে আবার বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে খুলনা মহানগর ও জেলায় মোট ৭১ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে কেবল গুলি করেই হত্যা করা হয়েছে ২৩ জনকে। অন্যান্যদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে কিংবা পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ৭১ জন নিহতের ঘটনায় খুলনা মহানগর ও জেলা মিলে মোট ৬৯টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, কারণ একটি একক ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছিলেন। অন্যদের কুপিয়ে বা পিটিয়ে খুন করা হয়েছে। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে নগর এলাকায় ৩৪টি হত্যা মামলা হয়েছে।
১৫ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি হত্যাকাণ্ড
সর্বশেষ ২২ অক্টোবর খুলনা নগরে ১৫ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি পৃথক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই দিন সকালে পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় তাওহিদুল ইসলাম নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই দিন সন্ধ্যার পর নগরের জিন্নাহপাড়ায় বাসার কাছেই দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন গৃহবধূ খুশি আক্তার। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, দুটি হত্যাকাণ্ডের পেছনেই মাদকসংক্রান্ত বিরোধ কাজ করেছে। একই সঙ্গে দুই ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। খুলনা নগরের দক্ষিণ টুটপাড়ার কলেজশিক্ষক ধনঞ্জয় কুণ্ডু ওরফে আকাশ কুণ্ডু চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা করেন (দোকান আছে)।
পুলিশের তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নিহত তাওহিদুল ‘পলাশ গ্রুপের’ সদস্য ছিলেন। এই গ্রুপের সঙ্গে রনি চৌধুরী বাবু ওরফে ‘গ্রেনেড বাবু’ গ্রুপ বা বি কোম্পানির বিরোধ দীর্ঘদিনের। তাওহিদুল হত্যাকাণ্ডে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। এজাহারে বি কোম্পানির সদস্য শহিদুল ইসলাম ওরফে সেজান, সাকিবুর রহমান ওরফে জিতু ও রাব্বি চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ‘পলাশ গ্রুপের’ প্রধান শেখ পলাশ একসময় নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর তাঁর উত্থান ঘটে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, খুলনা-২ আসনের সেই সময়ের সংসদ সদস্য মো. মিজানুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে পলাশ প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন এবং নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলেন। ২০১৫ সালের এপ্রিলে গ্রেপ্তারের পর পলাশ কিছুদিন কারাগারে ছিলেন। ‘যা পারে এবার পুলিশ করবে, আমরা মামলা করব না’।
সক্রিয় ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপ ও আধিপত্যের লড়াই
খুলনায় সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধের বেশির ভাগ ঘটনায় ঘুরেফিরে নয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, পুরো খুলনা শহরেই বাবু গ্রুপের আধিপত্য রয়েছে। নুর আজিম ও আশিক গ্রুপের আধিপত্য খুলনা সদর ও লবণচরা থানা এলাকায় বিস্তার লাভ করেছে। অন্যদিকে খুলনা জেলা পুলিশের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, দিঘলিয়া, আরংঘাটা, কয়রা, পাইকগাছা ও ডুমুরিয়ায় ছোট ছোট সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। শাওন গ্রুপ সক্রিয় সোনাডাঙ্গা ও খালিশপুরে, আরমান গ্রুপ ও হুমা বাহিনীর আধিপত্য দৌলতপুর ও খানজাহান আলী থানা এলাকায়। স্থানীয় আধিপত্য, জমি, ঘের, বালুর ব্যবসা, পরিবহন ও ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এসব গোষ্ঠী প্রায়ই বিরোধে জড়ায়। গত আগস্টের শেষ সপ্তাহে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর খুলনায় কয়েকটি এলাকায় তাঁর বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর খুলনার মিস্ত্রিপাড়া, বানরগাতি, আরামবাগ, নিরালা, পশ্চিম বানিয়াখামার, রূপসা বাগমারা ও সোনাডাঙ্গা এলাকায় নতুন করে অপরাধ চক্রের পুনর্বিন্যাস ঘটে। বিভিন্ন গ্রুপের প্রধানরা সরাসরি বা কারাগার থেকে অনুসারীদের নিয়ন্ত্রণ করছেন। যেমন, গ্রেনেড বাবুর নামে বিভিন্ন থানায় হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মারধরসহ অন্তত ১৭টি মামলা রয়েছে। অন্যদিকে আরেক গ্রুপের প্রধান নুর আজিম ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে কারাগারে থাকা সত্ত্বেও তাঁর অনুসারীরা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। আর নাসিম গ্রুপের প্রধান নাসিমুল গণিকে ৪ অক্টোবর দিঘলিয়া উপজেলায় গুলি করে হত্যা করা হয়। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ যৌথ বাহিনীর হাতে খুলনার সোনাডাঙ্গা থেকে ১০ সহযোগী এবং অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হন শেখ পলাশ। কারাগারে থাকায় তাঁর বাহিনীর অনেকে এখন নূর আজিম ও আশিক গ্রুপে মিশে গেছেন।
চাঁদাবাজি ও মাদকের বিস্তার
পুলিশ জানিয়েছে, নুর আজিম ও গ্রেনেড বাবু গ্রুপের সদস্যরা বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে। অনেক সময় এক গ্রুপ চাঁদাবাজি করে অন্য গ্রুপের নাম ব্যবহার করে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) তথ্য অনুযায়ী, মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত কিছু গোষ্ঠী তাদের বিক্রেতা ও সহযোগীদের মোটরসাইকেল, মাসিক বেতন ও আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ করে থাকে। কিশোর গ্যাং, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূল করা না গেলে খুলনার জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হবে।
চলতি বছরের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত নগরে ৩৪টি হত্যা মামলার মধ্যে ১৪টি হত্যাকাণ্ডই ঘটেছে গুলি করে। জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায়ও অপরাধের মাত্রা বেশি। জেলা পুলিশের হিসাবে, ২০২১ সালে ৩০টি, ২০২২ সালে ২২টি, ২০২৩ সালে ২১টি, ২০২৪ সালে ৩১টি এবং ২০২৫ সালেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক হত্যাকাণ্ড ঘটে। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের বাইরেও জেলায় অন্তত ৩০টি হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে অস্ত্র ব্যবহার করা হয়।
সাম্প্রতিক গুলির ঘটনা ও সাধারণ মানুষের ভয়াবহতা
খুলনা নগর ও জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে গুলি ও সশস্ত্র হামলার ঘটনায় সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, শিক্ষক, স্কুলছাত্রী, নারী ও পথচারীরাও আক্রান্ত হয়েছেন। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৬ জন। এসব ঘটনায় অস্ত্র আইনে ৪৩টি মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন ৭৫ জন। চলতি বছরের শুরু থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় গুলির ঘটনায় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, নারী, শিক্ষক, স্কুলছাত্রী, পথচারীরাও আক্রান্ত হয়েছেন।
- ১৮ অক্টোবর মধ্যরাতে টুটপাড়া আমতলা মোড়ে শেখ জুম্মান রহমান নামের এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন।
- ৩ জুলাই সন্ধ্যায় খুলনা নগরের রূপসার নতুন বাজার বেড়িবাঁধ সড়ক এলাকায় দশম শ্রেণির এক ছাত্রী (১৫) গুলিবিদ্ধ হয়।
- ২ জুলাই নগরের লবণচরা থানার আশীবিঘা বালুর মাঠ এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে রাতুল শেখ নামের এক তরুণ গুরুতর আহত হন।
- বিভিন্ন সময়ে মোটরসাইকেলে এসে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যাওয়ার একাধিক ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
অবৈধ অস্ত্রের জোগান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ধারণা, ভারত সীমান্তপথে খুলনায় বিপুল পরিমাণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশ করছে। কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নগরে ২৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছিল। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৭টিতে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে পুলিশ বেশ কিছু অবৈধ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করেছে। তবে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ না হওয়ায় অপরাধের প্রবণতা কমছে না। খুলনায় এক দিনে তিন ঘটনা: যুবদল নেতা ও মুদিদোকানিকে গুলি, ক্লিনিকে ভাঙচুর। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ৩০টি বিদেশি পিস্তল ও ৭টি বিদেশি রিভলবার রয়েছে।
খুলনা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া জানান, বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে মাদক-সম্পর্কিত বিরোধ ও আধিপত্যের লড়াই বিদ্যমান। অপরাধীদের ধরতে ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে স্থানীয় সুশীল সমাজ ও বিএনপির নেতৃবৃন্দ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি দাবি করেছেন।
সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া
খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তাঁরা পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ (আইজিপি) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলা সাধারণ সম্পাদক কুদরত-এ-খুদা বলেন, পুলিশের সঠিক তদারকি ও দায়িত্ব পালনে ঘাটতির কারণেই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত না করা গেলে অপরাধ হ্রাস করা সম্ভব হবে না।








