কেন ব্যালন ডি’অর অধরা থাকছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের কাছে

Published: October 28, 2026, 8:57 am

ফুটবল বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সফল দেশ ব্রাজিল। একসময় ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে ছিল তাদের রাজকীয় উপস্থিতি। রোনালদো নাজারিও, রিভালদো, রোনালদিনিও কিংবা কাকার মতো জাদুকররা একের পর এক এই পুরস্কার জিতেছেন। কিন্তু সেই সোনালি সময় যেন এখন স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে আয়োজিত সাম্প্রতিক ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে রোনালদোর উপস্থিতি যেন সেই পুরনো দিনের কথাই মনে করিয়ে দেয়, যেখানে বর্তমানের ব্রাজিল কেবল অতীতের গৌরবেই বেঁচে আছে। তাঁদের পায়ের শিল্পে মুগ্ধ হয়েছে পৃথিবী। বিশ্বসেরার সোনালি বলটাও উঠেছে তাঁদের হাতে। ছেলেদের ব্যালন ডি’অর ট্রফি তুলে দিতে। বড় পর্দায় দেখানো হলো রোনালদোর বর্ণাঢ্য অতীত। হয়তো আগেই বুঝেছিলেন, এবার তাঁর হাতে সোনালি বল উঠছে না। তারপর যেন কারখানাটার উৎপাদনই কমে গেল। ১৯৯৩-৯৪ মৌসুমে ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় কাটিয়েছিলেন এই কিংবদন্তি স্ট্রাইকার। কিন্তু প্রতিভা আর তাঁর পূর্ণ বিকাশ তো এক জিনিস নয়।

গত এপ্রিলে ফরাসি পত্রিকা লেকিপকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিংবদন্তি রোমারিও সরাসরি বলেছিলেন, বর্তমান বাস্তবতায় কোনো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের পক্ষে ব্যালন ডি’অর জেতা সম্ভব নয়। বিষয়টি তখন অনেকের কাছে অতিরঞ্জিত মনে হলেও সম্প্রতি তা যেন আরও পরিষ্কার হয়েছে। গত মাসে ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস ও মার্কিনিওসের নাম থাকলেও, শেষ পর্যন্ত ভিনিসিয়ুস শীর্ষ দশেও জায়গা পাননি; তিনি হয়েছেন ১৭তম। এমনকি নারী ফুটবলারদের ক্ষেত্রেও চিত্রটি প্রায় একই; শুধু লোরেনা গোলকিপারদের তালিকায় পঞ্চম হয়েছেন। সঞ্চালক ও ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরির সে কী উচ্ছ্বাস। ভিনিসিয়ুস তো কিছুদিন আগেও অনেকের চোখে পুরস্কার জয়ের ফেবারিট ছিলেন।

পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৯ বছরে ব্রাজিলের জন্য ব্যালন ডি’অর জেতা একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। সবশেষ ২০০৭ সালে কাকা এই পুরস্কার জিতেছিলেন। এরপর থেকে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে মাত্র তিনবার ব্রাজিলের কোনো খেলোয়াড় শীর্ষ তিনে জায়গা পেয়েছেন—যার মধ্যে দুবার নেইমার (২০১৫ ও ২০১৭) এবং একবার ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (২০২৪)। অবশ্য ২০২৪ সালে ভিনিসিয়ুস ফিফা দ্য বেস্ট পুরস্কারে সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন, যা ব্যালন ডি’অরের চেয়ে ভিন্ন। এর আগে ২০১৯ সালে গোলকিপার আলিসন বেকার সেরা গোলকিপার হয়েছিলেন, তবে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে মূল পুরস্কারের গুরুত্ব ভিন্ন মাত্রার। শেষবার কোনো ব্রাজিলিয়ানের হাতে উঠেছিল ২০০৭ সালে। তারপর কেটে গেছে ১৯ বছর। ১১ বছর পর ২০১৮ সালে সেই আধিপত্যে প্রথম বড় ধাক্কা দিলেন লুকা মদরিচ। মাঠের পারফরম্যান্সে দুই মহাতারকার পেছনেই থেকে গেছেন নেইমার। হাতে ব্যালন ডি’অর, মাথায় ব্যবসার বুদ্ধি—যেভাবে দুই ভুবনের ‘রাজা’ কেইন।

ঐতিহাসিকভাবে ব্যালন ডি’অরের নিয়ম কানুনও একটি বড় কারণ। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত এই পুরস্কার শুধু ইউরোপীয় খেলোয়াড়দের জন্য সংরক্ষিত ছিল। ১৯৯৫ সালে নিয়ম পরিবর্তনের পর ব্রাজিলিয়ানরা দাপটের সঙ্গে খেলতে থাকেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত মাত্র চারবার শীর্ষ তিনে কোনো ব্রাজিলিয়ান ছিলেন না। ওই সময়ে পাঁচবার পুরস্কারটি গিয়েছে ব্রাজিলের ঘরে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দীর্ঘ আধিপত্যের কবলে পড়ে অন্যদের জন্য সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়। বছরগুলো ২০০০, ২০০১, ২০০৩ ও ২০০৬। ইউরোপের ক্লাবে খেললেও অন্য মহাদেশের কেউ বিবেচিত হতেন না। দোষটা চাইলে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে দিতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পিছিয়ে পড়ার পেছনে ব্রাজিলের ফুটবল পরিকাঠামোর গভীর সংকট রয়েছে।

ফ্ল্যাশস্কোরের আঞ্চলিক পরিচালক আলেকজান্দ্রে ভাসকনসেলোস মনে করেন, বয়সভিত্তিক পর্যায়ে ফুটবলার গড়ার মূল কাঠামো ঢেলে সাজানো জরুরি। ক্রীড়া বিপণন, যোগাযোগ ও খেলাধুলায় উদ্ভাবনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং ব্রাজিলে ফ্ল্যাশস্কোরের আঞ্চলিক পরিচালক আলেকজান্দ্রে ভাসকনসেলোস সমস্যাটা দেখছেন একেবারে গোড়ায়।

তিনি উল্লেখ করেন, সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার, ফুলব্যাক ও সেন্টার ফরোয়ার্ডের যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।

এদিকে কোচ রজার মাচাদোর মতে, আন্তর্জাতিক ফুটবল এখন এতটাই প্রতিযোগিতামূলক যে ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন বা পর্তুগালের মতো দেশগুলো অনেক বেশি দক্ষ খেলোয়াড় তৈরি করছে, যেখানে ব্রাজিল সেই তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। তাঁর ভাষায়, ‘বিশ্বের সেরা ১০ খেলোয়াড়ের তালিকায় কোনো ব্রাজিলিয়ানের না থাকাটাই প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক ফুটবল কতটা প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে।

রোমারিওর বিশ্লেষণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। তাঁর মতে, ১৫-২০ বছর আগে খেলোয়াড়দের যে উন্মুক্ত ও প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ ছিল, এখনকার কঠোর নিয়মতান্ত্রিক ও কৌশলী ফুটবলে তা অনুপস্থিত। ব্রাজিলের সেই সহজাত ‘রাস্তার ফুটবল’—যেখানে ছিল না কোনো কোচের বাঁধাধরা নিয়ম বা জটিল কৌশল—সেই পরিবেশ হারিয়ে যাওয়ায় প্রতিভাবানদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া আধুনিক ফুটবলে শিল্পের চেয়ে শারীরিক শক্তি ও গতির ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা ব্রাজিলের শৈল্পিক ধারার সঙ্গে মানানসই নয়।

একই সঙ্গে দলের ওপর একক নির্ভরতাকেও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। নেইমার বা ভিনিসিয়ুসের মতো তারকাদের ওপর পুরো দেশের স্বপ্নভার চাপিয়ে দেওয়া ব্রাজিলীয় ফুটবলের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স বা জার্মানির মতো দেশগুলো নিয়মিত ব্যালন ডি’অর জেতা খেলোয়াড় উপহার দিচ্ছে, কিন্তু পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল কেন সেই তালিকার শীর্ষে নেই, তা এখন বড় গবেষণার বিষয়। বর্তমানের বাস্তবতায় ব্রাজিল এখন অতীতের তারকাদের দিকে তাকিয়ে থাকলেও নতুন প্রজন্মের প্রতিভার বিকাশে যে পরিবর্তনের প্রয়োজন, তা এখনো দৃশ্যমান নয়। তবে বিশ্ব ফুটবলের চূড়ায় এর ইতিবাচক প্রভাব দেখতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।’।