হেমন্তের এক স্বচ্ছ সকালে পঞ্চগড়ের দিগন্তজোড়া মাঠের ওপর থেকে খালি চোখে ধরা না দিলেও ক্যামেরার লেন্সে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট। এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন আলোকচিত্রী ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষক ফিরোজ আল সাবাহ। দীর্ঘ আট বছরের নিরলস অনুসন্ধান, বৈজ্ঞানিক হিসাব-নিকাশ এবং ধৈর্যের ফসল হিসেবে তিনি গত ২৬ অক্টোবর ২০২৬ সালে পঞ্চগড়ের মাটি থেকে এভারেস্ট ও হিমালয়ের বিভিন্ন শৃঙ্গের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে সক্ষম হন। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। হেমন্তের শীতল বাতাসে কাঁপছে চারপাশ, দিগন্তজোড়া সবুজ ধানখেতে পড়েছে হলুদের আভা। মাঝখানে শত শত কিলোমিটারের দূরত্ব, অথচ অনুকূল আবহাওয়ায় দিগন্তে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে হিমালয়ের বরফঢাকা শিখর। এত দূরের পর্বতকে খালি চোখে বা ক্যামেরায় দেখতে হলে শুধু গন্তব্যের আকাশ পরিষ্কার থাকলেই চলে না; মাঝখানের পুরো দৃষ্টিপথও থাকতে হয় মেঘ, কুয়াশা ও ধুলাকণামুক্ত। সেই বছর ছবি ধারণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন তিনি। তবে নিজের পর্যবেক্ষণ নিয়ে সন্দিহান হননি ফিরোজ। তাঁর ভাষ্যে, ‘আমি তো নিজের চোখে দেখছি। আমি যে জিনিসটা দেখছি, সেটাকে অন্য কেউ অস্বীকার করলেই তো আর সেটা মিথ্যা হয়ে যায় না। পঞ্চগড়ে আকাশ পরিষ্কার থাকলেও মাঝখানে নেপালের কোনো পাহাড়ে মেঘ জমলে দৃশ্যটি হারিয়ে যেতে পারে। তবে এটি কোনো নির্দিষ্ট দিনের নিশ্চয়তা নয়; আবহাওয়া ও দৃশ্যমানতার ওপরই সবকিছু নির্ভর করে।
ফিরোজের এই অনুসন্ধানের সূচনা হয়েছিল ২০১৮ সালে। সেই সময় তাঁর মনে একটি সাধারণ কিন্তু কৌতূহলী প্রশ্ন জাগে—পঞ্চগড় থেকে যদি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়, তবে মাউন্ট এভারেস্ট কেন নয়? এই প্রশ্নটিই তাঁকে হিমালয়ের উচ্চতা, পর্যবেক্ষকের অবস্থান এবং পৃথিবীর বক্রতার গাণিতিক হিসাব করতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি বুঝতে পারেন, এই দূরত্ব প্রায় ২৬০ থেকে ২৭০ কিলোমিটার এবং এই দৃশ্য দেখার জন্য বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। প্রশ্নটি সাধারণ কৌতূহলে থেমে থাকেনি। নেপালের সামনের পাহাড়গুলোও অনেক সময় এভারেস্টকে আড়াল করে রাখে। কিন্তু প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়ার পাশাপাশি আসে সংশয় ও বিরূপ প্রতিক্রিয়াও। বাংলাদেশের কয়েকজন পর্বতারোহীও এভাবে এভারেস্ট দেখা সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সাধারণত বর্ষা বিদায় নেওয়া এবং শীতের আগমনের মধ্যবর্তী সময়ে বাতাসের ধুলাকণা, জলীয় বাষ্প ও অন্যান্য দূষণকণা কমে গেলে দূরের দৃশ্য দেখার সুযোগ বাড়ে। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার ক্ষেত্রে আবহাওয়ার কিছু লক্ষণ ধরে ধারণা করা যায়।
২০১৯ সালে তিনি প্রথমবারের মতো ড্রোনের সাহায্যে এভারেস্টের সম্ভাব্য উপস্থিতি শনাক্ত করেন। কিন্তু এভারেস্টের ক্ষেত্রে শর্তগুলো আরও কঠিন। এটা আগে থেকে নির্ভুলভাবে অনুমান করা খুব কঠিন।
এরপরের বছরগুলোতে তিনি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের কাজ চালিয়ে যান। বিশেষ করে ২০২২ সালে তিনি ড্রোন ব্যবহারের পাশাপাশি মাটি থেকেও পর্যবেক্ষণে সফল হন। তবে ২০২৩ সালে এভারেস্ট দেখার অনুকূল পরিবেশ পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে শৃঙ্গটি দৃশ্যমান হলেও তার স্পষ্টতা ছিল তুলনামূলক কম। অবশেষে ২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর প্রকৃতি যেন তাঁর দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতিদান দেয়। আলোকচিত্রের পাশাপাশি বন্য প্রাণী সংরক্ষণ নিয়েও কাজ করেন তিনি। এ অনুসন্ধানে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল মাঝখানের অন্যান্য পর্বতশ্রেণি। কেউ প্রশংসা করেন, কেউ হাসাহাসি করেন, আবার কেউ ব্যঙ্গও করেন।
সেদিন সকালে আকাশ ছিল অসাধারণ স্বচ্ছ। হিমালয় অঞ্চলের শুষ্ক উত্তুরে বাতাস প্রবাহিত হওয়ার ফলে দৃষ্টিপথের সব ধুলাবালি ও জলীয় বাষ্প দূর হয়েছিল, যা এভারেস্ট দেখার পথ প্রশস্ত করে। ফিরোজ জানান, এমন পরিস্থিতি বছরে বড়জোর দুই থেকে চার দিন তৈরি হতে পারে। এত বিশাল পর্বতমালা প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হলেও ক্যামেরার ফ্রেমে সেটি ধারণ করার সময় তাঁর হাত কাঁপছিল, যা তাঁর আট বছরের পরিশ্রমের সার্থকতা প্রমাণ করে। দূরে গ্রামের বাড়িঘর, পাখির ডাক আর উত্তর দিক থেকে বয়ে আসা হিমেল হাওয়া। তাঁর ভাষায়, এবারের দৃশ্যমানতা ছিল অসাধারণ।
ফিরোজের এই ভিডিওচিত্রের নাম দিয়েছেন ‘দ্য সিক্সটি-ডিগ্রি হিমালয়ান হরাইজন’। এতে শুধু এভারেস্টই নয়, বরং মাউন্ট মাকালু, মাউন্ট লোৎসে এবং চামলাং ইস্ট ও ওয়েস্টের মতো আট হাজার মিটারের বেশি উচ্চতার পর্বতশৃঙ্গগুলোও উঠে এসেছে। তিনি ড্রোনের উচ্চতা ও ফোকাল লেন্সের জুম ব্যবহার করে হিমালয়ের বিস্তৃত ব্যাপ্তি দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছেন, যেন দর্শকরা পর্বতমালার বিশালতার ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন।
২০১২ সাল থেকেই পঞ্চগড় থেকে পাহাড় দেখার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন ফিরোজ। তাঁর মতে, পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা এখন অনেকের কাছে পরিচিত হলেও এভারেস্ট দেখার ঘটনাটি ভূগোলের বইয়ের দূরত্বকে বাস্তবে বিস্ময়ে রূপান্তর করেছে। তবে এই বিরল দৃশ্য উপভোগের পাশাপাশি পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। যেকোনো পর্যটন এলাকায় ভিড় বা অসচেতন আচরণ প্রকৃতির সৌন্দর্য নষ্ট করতে পারে বলে মনে করেন এই আলোকচিত্রী।
ফিরোজের মতে, প্রকৃতিকে ভালোবাসার অর্থ কেবল তার সৌন্দর্য উপভোগ নয়, বরং তা সংরক্ষণের দায়িত্ব নেওয়া। তিনি পঞ্চগড়ের যে স্থান থেকে এই ছবি তুলেছেন, সেটির গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিকেও তিনি পরিবেশ রক্ষার একটি অংশ হিসেবে দেখেন। এভারেস্টের মতো শৃঙ্গগুলোকে ক্যামেরায় ধারণ করা কেবল একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে যথাযথ অনুসন্ধান ও ধৈর্য থাকলে প্রকৃতির অনেক রহস্যই সাধারণের চোখের সামনে উঠে আসতে পারে।
এই দীর্ঘ আট বছরের যাত্রা শেষে ফিরোজ আল সাবাহ মনে করেন, পৃথিবীর অনেক বিস্ময়ই আমাদের খুব কাছাকাছি থাকে। প্রয়োজন শুধু প্রশ্ন করার মানসিকতা এবং সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করার ধৈর্য। ২৬ অক্টোবরের সেই হেমন্তের সকাল তাঁর কাছে কেবল একটি তারিখ নয়, বরং এক দীর্ঘ স্বপ্নপূরণের দিন হিসেবে স্মরণে থাকবে।








