মিথ্যা বলতে গেলে কেন বেশি মানসিক চাপ তৈরি হয়, গবেষণার তথ্য

Published: November 3, 2026, 4:26 am

আমাদের পরিচিত অনেক মানুষ এত নিপুণভাবে বানিয়ে কথা বলেন যে তাঁদের সহজেই বিশ্বাস করে ফেলা হয়। বাইরে থেকে সহজ মনে হলেও মনস্তাত্ত্বিক গবেষণার মতে, মিথ্যা বলার প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল ও মানসিক পরিশ্রমের। জার্মানির মারবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক তাবেয়া ভেখটারশয়জার ও ক্রিস্টিনা জুখোৎস্কির ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সত্য বলার তুলনায় বানিয়ে কথা বা মিথ্যা বলতে মানুষের ওপর অনেক বেশি মানসিক ও আবেগগত চাপ তৈরি হয়। এই মানুষগুলোর মনের ভেতরটা আদতে কেমন। কিছু মানুষ কথার জালে অন্যকে আটকে ফেলতে সিদ্ধহস্ত। অন্যদিকে যাঁকে মিথ্যা বলা হচ্ছে, তিনি হয়তো বিশ্বাস আর সন্দেহের দোলাচলে পড়ে যান। বিশ্বাস করতে চান; অথচ মনের ভেতর খচখচ করে। আর কীভাবেই–বা বোঝা সম্ভব, কেউ মিথ্যা বলছেন কি না। এ ছাড়া মিথ্যাবাদীকে নিজের বলা কথাও মনে রাখতে হয়। এভাবে একটি মিথ্যা ঢাকতে গিয়ে কখনো কখনো আরও অনেক মিথ্যার জন্ম হয়।

গবেষকদের দেওয়া ‘অ্যাকটিভেশন–ডিসিশন–কনস্ট্রাকশন–অ্যাকশন’ শীর্ষক তাত্ত্বিক মডেল অনুযায়ী, মিথ্যা বলার পুরো বিষয়টি মোট চারটি ধাপে ঘটে থাকে। এগুলো হলো

মিথ্যা বলার চার ধাপ

  • ১. সত্য মনে করামূল ঘটনা বা সত্য বিষয়টি প্রথমে স্মরণে আনা।
  • ২. সিদ্ধান্ত নেওয়াপরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সত্য বলবেন নাকি মিথ্যা, তা ঠিক করা।
  • ৩. মিথ্যা সাজানোমূল ঘটনার বদলে কী উত্তর দিলে তা বিশ্বাসযোগ্য হবে, সেটি মন থেকে তৈরি করা।
  • ৪. মিথ্যা বলাসাজানো বানিয়ে বলা উত্তরটি শেষ পর্যন্ত অপরের কাছে উপস্থাপন করা।

এসব প্রক্রিয়ায় প্রতিটি পদক্ষেপে চিন্তাশক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন পড়ে। বানানোর পাশাপাশি আগের বক্তব্যের সঙ্গে সমতা রাখা ও বৈপরীত্য এড়িয়ে চলার বাধ্যবাধকতা থাকে। কথা লুকানোর পেছনে ভয়, অপরাধবোধ কিংবা মানসিক দুশ্চিন্তা কাজ করলে প্রক্রিয়াটি আরও কঠিন আকার ধারণ করে। নিজের একটি বানিয়ে বলা তথ্য গোপন রাখার জন্য পরবর্তীতে অনেক সময় আরও বেশ কিছু অসত্য বক্তব্য তৈরির ফাঁদে পড়তে হয়।

গবেষণাটি পরিচালনায় বিজ্ঞানীরা দুটি স্বতন্ত্র পরীক্ষা পরিচালনা করেন, যেখানে মোট ৯৭ জন (প্রথম ধাপে ৪৯ জন এবং দ্বিতীয় ধাপে ৪৮ জন) অংশ নিয়েছিলেন।

পরীক্ষার শুরুতে একটি কৃত্রিম অপরাধমূলক পটভূমি তৈরি করা হয়েছিল; প্রথম ধাপে ইউএসবি স্টিক সরিয়ে ফেলা এবং দ্বিতীয়টিতে খাম থেকে ১ হাজার ইউরো নেওয়ার মতো কাল্পনিক পরিস্থিতি দেওয়া হয়। এর পর প্রশ্নের উত্তরে কম্পিউটার স্ক্রিনে কখনো সত্য এবং কখনো মিথ্যা উত্তর দিতে বলা হয়, যেখানে সাধারণ দৈনন্দিন প্রশ্নের বাইরে কৃত্রিম অপরাধ সম্পর্কিত প্রশ্নও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পরীক্ষায় পাওয়া ফলাফলে দেখা গেছে, স্বাভাবিক সত্য বলার চেয়ে অসত্য বা ভুল উত্তর দিতে মানুষের তুলনামূলক বেশি সময় লেগেছে। সত্য আড়াল করে বানানো তথ্যে যাওয়ার সময়টিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা স্পষ্টত উচ্চমাত্রার উদ্বেগ, অপরাধবোধ ও মানসিক টানাপোড়েন অনুভব করেছেন। দৈনন্দিন বিষয়ে প্রশ্নের চেয়ে অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়ে উত্তর দেওয়ার প্রক্রিয়ায় এই চাপ বহুগুণ বেশি ছিল।

তবে একটি নিয়ন্ত্রিত ল্যাবরেটরির ভেতরে এ পরীক্ষা করা হয়েছে বলে বাস্তব জীবনের সবার ক্ষেত্রে একদম একই প্রতিক্রিয়া হবে—এমন সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। সচরাচর মানুষের কথাবার্তায় সামান্য অসঙ্গতি, অতিরিক্ত দেরি কিংবা অস্বাভাবিক মানসিক অস্বস্তি দেখলে আমরা মিথ্যা সন্দেহ করি। যদিও শুধু বাইরের কিছু শারীরিক পরিবর্তন কিংবা ভাবভঙ্গি দেখে কাউকেই পুরোপুরি মিথ্যাবাদী বলা বৈজ্ঞানিক নয়।

বাস্তব ক্ষেত্রে সাধারণ ভীতি, উদ্বেগ কিংবা অতিরিক্ত লজ্জাবোধের কারণেও একজন সত্যি বলা মানুষ থামতে পারেন বা অস্থিরতা দেখাতে পারেন। আবার প্রতিনিয়ত বানিয়ে বলায় অভ্যস্ত ব্যক্তি নিজের প্রকাশভঙ্গি ও আবেগ সুচারুভাবে আড়াল করে স্বতঃস্ফূর্ত থাকতে পারেন। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, চেনা মানুষের স্বাভাবিক আচরণের অসংগতি থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া গেলেও শেষ পর্যন্ত বক্তব্যের যুক্তিসঙ্গত মিল যাচাই করাই নির্ভরযোগ্য উপায়।

গবেষকদের মতে, মানুষ কথা লুকানোর সময় ব্রেন কীভাবে সাড়া দেয় ও কাজের ওপর কী চাপ সৃষ্টি হয় তা এ বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা গেছে, তবে এর মাধ্যমে মিথ্যাবাদী চেনার সুনির্দিষ্ট বা নির্ভুল কোনো কৌশল গড়ে ওঠেনি। গবেষণাপত্রটির বিভিন্ন তথ্য ‘সাইকোলজি টুডে’ এবং ‘কগনিশন অ্যান্ড ইমোশন’-এ আলোচিত হয়েছে।

  • গবেষকেরা দুটি পরীক্ষা চালিয়েছেন। প্রথমটিতে অংশ নেন ৪৯ জন, দ্বিতীয়টিতে ৪৮ জন, অর্থাৎ মোট ৯৭ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।