সর্বকালের সেরা ১০ বক্স অফিস জয়ী সিনেমা, সাফল্যের পেছনের রহস্য কী

Published: November 3, 2026, 3:45 am

হলিউডের সিনেমা জগতে ব্লকবাস্টার তৈরির লড়াই দীর্ঘদিনের। ১৯৭৫ সালে স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘জস’ সিনেমাটি উত্তর আমেরিকার বক্স অফিসে ১০ কোটি ডলারের বেশি আয় করে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছিল। সেই সময় থেকেই বড় বাজেটের সিনেমা তৈরির মাধ্যমে বিপুল মুনাফা অর্জন প্রযোজনা সংস্থাগুলোর মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে। তবে সিনেমার ব্যবসায় শতকোটি ডলার আয় করার কোনো সুনির্দিষ্ট বা সহজ সূত্র নেই। অর্থাৎ হলিউডের বাইরের একটি দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পুরাণভিত্তিক অ্যানিমেশনও যে বিশ্ব বক্স অফিসে বড় সাফল্য পেতে পারে, তার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে ‘নে ঝা ২’। টিকিটের বাড়তি দাম দিয়েও দর্শকেরা সিনেমাটি দেখতে আগ্রহী হয়েছিলেন।

ফোর্বসের বিনোদনবিষয়ক লেখক টিম ল্যামারসের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়ের তালিকায় থাকা সিনেমাগুলোর সাফল্যের পেছনে দুটি প্রধান অনুষঙ্গ কাজ করেছে—দর্শকের সঙ্গে গল্পের শক্তিশালী সংযোগ এবং জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি বা পরিচিত চরিত্রের আবেদন। ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী বক্স অফিসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন যে, পরিচিত কাহিনি ও আবেগনির্ভর নির্মাণশৈলীই মূলত ব্লকবাস্টার ছবিগুলোর সাফল্যের নেপথ্যে কাজ করেছে। নাভি জনগোষ্ঠীর সদস্য নেইতিরির প্রেমে পড়ে ধীরে ধীরে বদলে যায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি।

বিশ্বব্যাপী বক্স অফিসের হিসাব অনুযায়ী, সর্বকালের সেরা ১০টি সিনেমার তালিকার ৮টিই ২০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছে।

বাকি দুটি ছবিও এই মাইলফলকের খুব কাছাকাছি রয়েছে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’, যার আয় ২৯৪ কোটি ১০ লাখ ডলার। এরপর রয়েছে ২০০৯ সালের ‘অ্যাভাটার’ (২৯২ কোটি ৩০ লাখ ডলার), ২০২৬ সালের ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ (২৫১ কোটি ৯০ লাখ ডলার), ২০২২ সালের ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’ (২৩৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার), ২০২৫ সালের ‘নে ঝা ২’ (২২৭ কোটি ডলার) এবং ১৯৯৭ সালের ‘টাইটানিক’ (২২৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার)। ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ (২০১৯)—২৯৪ কোটি ১০ লাখ ডলার। ‘অ্যাভাটার’ (২০০৯)—২৯২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ (২০২৬)—২৫১ কোটি ৯০ লাখ ডলার। ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’ (২০২২)—২৩৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ‘নে ঝা ২’ (২০২৫)—২২৭ কোটি ডলার। 2019, 294, 10, 2009, 292, 30, 2026, 251, 90, 2022, 233, 40, 2, 2025, 227, 1997, 226, 2015, 207, 2018, 205, 20. ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’ (২০২১)—১৯২ কোটি ১০ লাখ ডলার। ‘জুটোপিয়া ২’ (২০২৫)—১৮৭ কোটি ডলার। তালিকার সেরা ১০ সিনেমার মধ্যে একমাত্র ‘টাইটানিক’ই সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কার জিতেছে।

‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ মূলত মার্ভেল সিনেমাটিক ইউনিভার্সের দীর্ঘদিনের গল্পের এক আবেগঘন পরিণতি। ২০০৮ সালের ‘আয়রন ম্যান’ থেকে শুরু করে এক দশকের বেশি সময় ধরে দর্শকেরা এই চরিত্রগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। ২০১৮ সালের ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ইনফিনিটি ওয়ার’-এর শেষে থানোসের আঙুলের চুটকিতে মহাবিশ্বের অর্ধেক প্রাণের বিলীন হওয়ার ঘটনার পর, এন্ডগেমে সেই প্রিয় চরিত্রগুলোর ত্যাগ ও লড়াই দেখার জন্য প্রেক্ষাগৃহে ভিড় করেছিলেন ভক্তরা। যদিও ২০২৪ সালে মার্ভেল জানিয়েছে, অ্যাভেঞ্জাররা আবারও ফিরছে। হারিয়ে যাওয়া মানুষদের ফিরিয়ে আনতে অ্যাভেঞ্জাররা শুরু করে সময়ভ্রমণের এক বিপজ্জনক অভিযান। ২০১৯ সালের পর ডিজনির প্রযোজিত মার্ভেল সিনেমাগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাপী ১০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করতে পেরেছে মাত্র একটি-২০২৪ সালের ডেডপুল অ্যান্ড উলভারিন।

জেমস ক্যামেরনের ‘অ্যাভাটার’ মুক্তি পাওয়ার ১৩ বছর পর এর সিক্যুয়েল ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’ মুক্তি পায়। প্রথম ছবির বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে সিক্যুয়েলটিও ২৩৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার আয় করে। ক্যামেরনের পরিচালনায় ২০০০ কোটি ডলারের বেশি আয় করা ছবির সংখ্যা এখন তিনটি—টাইটানিক, অ্যাভাটার ও অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার। ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ভিন্ন এক গ্রহের জাদুকরী অভিজ্ঞতাই দর্শকদের বারবার প্রেক্ষাগৃহে টেনেছে। তবে শুধু গল্প নয়, ছবিটির ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তি ও চোখধাঁধানো দৃশ্যও দর্শকদের আকৃষ্ট করেছিল।

তালিকার পঞ্চম স্থানে থাকা চীনা অ্যানিমেশন ‘নে ঝা ২’ (২০২৫) বা ইউ ইয়াং পরিচালিত এই অ্যাকশন-ফ্যান্টাসি সিনেমাটি চীনা পুরাণের জনপ্রিয় চরিত্র নে ঝাকে নিয়ে নির্মিত। ছবিটি বিশ্বব্যাপী ২২৭ কোটি ডলার আয় করেছে, যার বড় অংশ এসেছে চীন থেকে। মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তেই ১ কোটি ৭১ লাখ ডলার আয় করে শুরু করা ছবিটি শেষ পর্যন্ত উত্তর আমেরিকায় ২৬ কোটি ৩৪ লাখ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ২৫ কোটি ৬৬ লাখ ডলার আয় করে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫২ কোটি ডলারের বাজার গড়েছে। কেন পারসনসের স্বল্প বাজেটের হরর ছবি ‘ব্যাকরুমস’ ১ কোটি ডলার খরচে তৈরি হয়েও ৪০ কোটি ডলার আয়ের নজির স্থাপন করেছে। মোট আয়ের প্রায় ২২০ কোটি ৯০ লাখ ডলারই এসেছে দেশটি থেকে। বড় পর্দায় নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা দিতে সক্ষম হয়েছিল ছবিটি। কারণ, শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করে সম্পূর্ণ নতুন গল্প ও চরিত্র নিয়ে ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে প্রতিষ্ঠিত ফ্র্যাঞ্চাইজির নতুন কিস্তি নির্মাণ তুলনামূলক নিরাপদ বলে মনে করে তারা।

সর্বকালের সেরা তালিকায় জেমস ক্যামেরনের ‘টাইটানিক’ কিছুটা ব্যতিক্রম। অধিকাংশ শীর্ষ সিনেমা যেখানে কল্পবিজ্ঞান বা সুপারহিরো ঘরানার, সেখানে টাইটানিক বাস্তব জীবনের ঐতিহাসিক দুর্ঘটনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। ১৯১২ সালের আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে যাওয়া জাহাজ এবং জ্যাক ও রোজের কাল্পনিক প্রেমকাহিনি শ্রেণিবৈষম্য ও ত্যাগের এক চিরন্তন আখ্যান তুলে ধরেছে, যা ১১টি অস্কার জয়ের পাশাপাশি আকাশচুম্বী ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছে। কাল্পনিক গ্রহ প্যান্ডোরার পটভূমিতে নির্মিত এই ছবিতে দেখা যায়, সাবেক সেনাসদস্য জেক সালি সেখানে গিয়ে এক ভিন্ন জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন। পৃথিবীর মানুষের লোভ ও প্যান্ডোরার প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দাঁড়ান তিনি। এবার প্যান্ডোরার জলজ পরিবেশ ও মেটকায়িনা জনগোষ্ঠীকে ঘিরে এগিয়েছে গল্প। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও ও কেট উইন্সলেট অভিনীত ছবিটিতে জ্যাক ও রোজের প্রেমের গল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১৯১২ সালে আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে যাওয়া টাইটানিক জাহাজের মর্মান্তিক ঘটনা। ১১টি অস্কার জেতা ছবিটি শিল্প ও বাণিজ্য—দুই ক্ষেত্রেই বিরল সাফল্য পেয়েছে।

বিশ্লেষণে স্পষ্ট যে, শীর্ষ ১০ সিনেমার মধ্যে ৯টিই আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি বা জনপ্রিয় ঘরানার। ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’, ‘ইনফিনিটি ওয়ার’, ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ এবং ‘নো ওয়ে হোম’-এর মতো সুপারহিরো সিনেমার আধিপত্য তাই অনস্বীকার্য। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন গল্পের তুলনায় পরিচিত ফ্র্যাঞ্চাইজিকে কম ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে। রবার্ট ডাউনি জুনিয়র, ক্রিস ইভানস, ক্রিস হেমসওয়ার্থ ও স্কারলেট জোহানসনের মতো তারকারা অভিনয় করেছেন এতে।

তবে কেবল পরিচিতি থাকলেই সাফল্য আসে না, বরং চরিত্রের সঙ্গে দর্শকের আবেগের সংযোগ থাকা জরুরি। যদিও ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’-এর পর থেকে দর্শক মহলে ‘সুপারহিরো ফ্যাটিগ’ বা একঘেয়েমি তৈরি হয়েছে, তবুও মার্ভেল ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’র মতো আসন্ন সিনেমা দিয়ে হারানো গৌরব ফেরাতে মরিয়া। ডক্টর স্ট্রেঞ্জ বা ব্ল্যাক প্যান্থারের মতো কিছু সিনেমা ব্যবসা করলেও সামগ্রিকভাবে সেই আগের বিপুল আয় ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্রেণিবৈষম্য, প্রেম, বিচ্ছেদ ও মৃত্যুর মতো সর্বজনীন আবেগ ছবিটিকে দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। পর্দার চরিত্রের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করতে পারলে কিংবা তাদের আনন্দ-বেদনার সঙ্গে একাত্ম হতে পারলে সেই সিনেমা দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। সুপারহিরো সিনেমায় ক্লান্তি, তবু আশা ছাড়ছে না হলিউড ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’ মুক্তির পর সুপারহিরো সিনেমা নিয়ে দর্শকের আগ্রহে ভাটা পড়তে শুরু করে।

শেষ পর্যন্ত বক্স অফিসের সাফল্য অনিশ্চিত। টম ক্রুজ অভিনীত ‘ডিগার’ (২০২৬)-এর ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, বড় তারকা বা বাজেটের চেয়েও দর্শককে টানার ক্ষমতা অন্য জায়গায়। ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ডার্ক নাইট’ বা ক্যামেরনের কাজের মতো কিছু উদাহরণ ছাড়া সব সিনেমা সব সময় সফল হয় না। তাই একটি বড় বাজেটের সিনেমা সফল হওয়ার পেছনে ফ্র্যাঞ্চাইজি ভ্যালু, আবেগ, গল্পের নতুনত্ব ও দর্শনীয় নির্মাণশৈলীর সঠিক মিশ্রণ থাকা অপরিহার্য।