স্পট ফিক্সিংয়ের ১৫ বছর: সেই লর্ডস টেস্টের কলঙ্কিত স্মৃতি

Published: November 3, 2026, 3:06 am

পাড়ার ক্রিকেট মাঠে বোলার বোলিং ক্রিজ পার হয়ে গেলে সতীর্থরা চিৎকার করে ওঠেন ‘নো বল’। ক্রিকেটের নিয়ম অনুযায়ী, এই ভুল বা বাড়তি বলের গুরুত্ব সাধারণ হলেও ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট লর্ডস টেস্টের তিনটি নো বল ছিল একেবারেই ভিন্ন। সেদিন যে চিত্রনাট্য রচিত হয়েছিল, তা কেবল মাঠের খেলাকেই কলঙ্কিত করেনি, বরং পাকিস্তান ক্রিকেটের তিন প্রতিভাবান তারকার ক্যারিয়ার ও জীবনের মোড় চিরতরে বদলে দিয়েছিল। আজ সেই বিতর্কিত ঘটনার ১৫ বছর পূর্ণ হলো। পাড়ার ক্রিকেটে ক্রিজ আঁকা হয় ইটের টুকরা বা সাদা চক দিয়ে। পা বোলিং ক্রিজে দাগের ওপাশে চলে গেলে আশপাশের সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘নো বল। ওভারস্টেপ হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিকেলের ঝগড়া সন্ধ্যা পর্যন্ত গড়ায়। কখনো কখনো সেই নো বলের জন্য ব্যাটসম্যানকে আবার নতুন করে জীবনও দিতে হয়। বোলারের জন্য সেটি ভুল, আম্পায়ারের জন্য একটি সিদ্ধান্ত। আজ সেই ঘটনার ১৫ বছর পূর্তিতে ফিরে দেখা যাক ক্রিকেটের অন্যতম আলোচিত স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারি। কী ঘটেছিল সেদিন, কীভাবে ধরা পড়েছিলেন ক্রিকেটাররা, আর এত বছর পর কোথায় দাঁড়িয়ে সেই তিন জীবন। আমিরের পা বেরিয়ে গেল বোলিং ক্রিজের সীমারেখার বাইরে। তখন পাকিস্তান ক্রিকেটে আমিরকে নিয়ে স্বপ্নের শেষ ছিল না।

এই ঘটনার সূত্রপাত কিন্তু মাঠের ভেতরে হয়নি।

২০১০ সালের আগস্টে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ‘নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর সাংবাদিকেরা ছদ্মবেশে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের এজেন্ট মাজহার মাজিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সাংবাদিকেরা গোপনে ক্যামেরা চালু রেখেছিলেন।

তারা নিজেদের বিনিয়োগকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে মাজিদের সামনে টাকার পাহাড় সাজিয়ে লর্ডস টেস্টে নির্দিষ্ট সময়ে আমির ও আসিফের নো বল করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। বাজিকরদের জন্য প্রতিটি নো বল ছিল বাজি ধরার উপলক্ষ, যেখানে ম্যাচের ফলের চেয়ে নির্দিষ্ট বলের ফলাফল আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। সাংবাদিকেরা নিজেদের পরিচয় দিয়েছিলেন ক্রিকেটে অর্থ বিনিয়োগে আগ্রহী ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে। মাজিদ তাঁদের আশ্বাস দেন, পাকিস্তানের কয়েকজন ক্রিকেটারকে দিয়ে ম্যাচের নির্দিষ্ট মুহূর্তে নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটানো সম্ভব। বিনিময়ে জুয়াড়িরা আগে থেকেই বাজি ধরতে পারবে। একটি নির্দিষ্ট বল কখন নো হবে, সেটি জানাই যথেষ্ট। গতি, নিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে পাকিস্তানের ক্রিকেটে নতুন এক বিস্ময়ের নাম হয়ে উঠছিলেন আমির।

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, লর্ডস টেস্টের ইনিংসের তৃতীয় ওভারের প্রথম বলটিই নো বল করেন তরুণ আমির। ধারাভাষ্যকারদের চোখেও বিষয়টি ছিল অস্বাভাবিক, কারণ পপিং ক্রিজ থেকে বলটি করার সময় তার পা প্রায় আধা মিটার দূরে ছিল। পরবর্তীতে দশম ওভারের ষষ্ঠ বলে আসিফও একইভাবে নো বল করেন। মাঠে উপস্থিত দর্শকেরা তখনো বুঝতে পারেননি যে, ক্রিকেটের মক্কাখ্যাত লর্ডসে কী ভয়াবহ এক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। আর দর্শকদের কাছে সামান্য বিরক্তির কারণ।

গোপন ভিডিও প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড মাজহার মাজিদকে গ্রেপ্তার করে এবং ক্রিকেটারদের মুঠোফোন জব্দ করে। শুরুর দিকে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) এবং দেশটির তৎকালীন হাই কমিশনার এই অভিযোগকে ষড়যন্ত্র বা খেলোয়াড়দের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা বলে দাবি করেছিলেন। এমনকি বোর্ড সভাপতি ইজাজ বাটও ক্রিকেটারদের নির্দোষ দাবি করেছিলেন। অনেকেই তাঁকে ভবিষ্যতের বড় তারকা ভাবতে শুরু করেছিলেন।

সেই সময় আমির ছিলেন মাত্র ১৮ বছর বয়সী বিশ্ব ক্রিকেটের এক বিস্ময়। বাঁহাতি পেসার হিসেবে তার উত্থান ছিল ঈর্ষণীয়। আসিফ ছিলেন দুই দিকে বল সুইং করাতে ওস্তাদ অভিজ্ঞ বোলার। আর সালমান বাট ছিলেন পাকিস্তান দলের অধিনায়ক, যিনি ২০০৯ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছিলেন। কিন্তু আইসিসি ২০১০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তাদের সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে এবং দীর্ঘ তদন্তের পর ২০১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আইসিসির ট্রাইব্যুনাল সালমান বাটকে ১০ বছর (পাঁচ বছর স্থগিতসহ) নিষিদ্ধ করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সংশয়ের জায়গা ছোট হয়ে আসে। বলকে দুই দিকে সুইং করানোর দক্ষতায় ব্যাটসম্যানদের নাভিশ্বাস তুলে দিতে পারতেন।

আইনি লড়াই কেবল ক্রিকেটীয় শাস্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০১১ সালের ৩ নভেম্বর লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টে সালমান বাট ও আসিফকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, যেখানে আমির ও মাজিদ আগেই নিজেদের দোষ স্বীকার করেছিলেন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ক্রিকেটের মূলধারায় ফেরা তাদের জন্য ছিল অত্যন্ত কঠিন ও অপমানজনক। আমির ২০১২ সালে এবং আসিফ ও বাট জুন মাসে মুক্তি পেলেও তাদের দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে। তাঁদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সেই কেলেঙ্কারির চারজন আসামির সাজা ঘোষণা হয়েছিল ২০১১ সালের ৩ নভেম্বর।

পরবর্তীতে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে আসিফ ও বাট মাঠে ফেরার অনুমতি পান। বাট ২০১৬ সালে ফিরেই সেঞ্চুরি করেন, তবে আমিরের ফেরার পথ ছিল সবচেয়ে বন্ধুর। অনেক সতীর্থ তাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিলেন। আমির ২০১৯ সালে ২৭ বছর বয়সে টেস্ট থেকে অবসর নেন এবং ২০২০ সালে সাদা বলের ক্রিকেট ছাড়েন। ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে সাময়িক অবসর ভেঙে ফিরেওছিলেন, তবে ডিসেম্বরে আবারও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) তদন্তে অবশ্য ‘জবাব দেওয়ার মতো যুক্তি’ খুঁজে পাওয়া গেল।

সালমান বাট বর্তমানে ধারাভাষ্য ও বিশ্লেষণীমূলক কাজ নিয়ে ব্যস্ত। মাঝখানে ২০২৩ সালে তাকে নির্বাচক প্যানেলের পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল পিসিবি। অন্যদিকে, মোহাম্মদ আসিফের ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন। তার দক্ষতা নিয়ে আজও ভক্তদের আক্ষেপ থাকলেও পিসিবি তাকে আর সুযোগ দেয়নি। তিনি নিজেই ২০২০ সালে দাবি করেছিলেন যে, ফিক্সিং কেবল তাদের সময়ই নয়, আগেও হয়েছে এবং পরেও হয়েছে।

লর্ডসের এই কলঙ্কিত অধ্যায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দেয়। আইসিসি ক্রিকেটারদের শিক্ষা, জুয়াড়িদের প্রস্তাব শনাক্তকরণ এবং কঠোর নজরদারির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। তবে দুর্নীতি পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। ২০১৮ সালে শারজিল খান এবং ২০২০ সালে উমর আকমল পাকিস্তান সুপার লিগ ও অন্যান্য দুর্নীতিবিরোধী বিধি ভঙ্গের দায়ে শাস্তির মুখোমুখি হন।

আজকের দিনে লর্ডস টেস্টের সেই ঘটনা কেবল তিন ক্রিকেটারের পতন নয়, বরং ক্রিকেটীয় স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার এক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়। অনলাইন বেটিং ও প্রযুক্তির যুগে দুর্নীতির ধরন বদলেছে, ফলে কেবল শাস্তির ভয় দেখিয়ে অপরাধ রোধ করা কঠিন। মাঠের সেই সাদা দাগটি এখনো সেখানেই আছে, কিন্তু সেই দাগ স্পর্শ করার আগে বোলারদের ওপর দর্শকের দৃষ্টি আর আগের মতো সরল নয়। সাবেক অধিনায়ক রশিদ লতিফ বলেছিলেন, ফাঁস হওয়া ভিডিওতে কিছু অস্পষ্টতা আছে।