দেশের নিজস্ব এআই অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি: রেহান আসিফ আসাদ

Published: November 5, 2026, 6:25 am

ডাক, টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ দেশের প্রযুক্তি খাতের সামগ্রিক সংস্কার ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন। কাজ করেছেন এটিঅ্যান্ডটি, জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি, এক্সপিডিয়া গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ পদে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সৈয়দ রিফাত মোসলেম।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে ব্যবস্থাপনা ও প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এই উপদেষ্টা মনে করেন, ডিজিটাল সেবার মান উন্নয়ন ও তথ্য নিরাপত্তার জন্য শক্তিশালী অবকাঠামো অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তার কিছু ফাঁকফোকর চিহ্নিত করে তা দূর করা হয়েছে।

তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর আইসিটি বিভাগের পূর্বের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনায় অসংগতি ধরা পড়েছে; উদাহরণস্বরূপ, চার শতাধিক গেম তৈরির দাবি থাকলেও প্রকৃত সংখ্যা মাত্র একশো, যার কার্যকারিতাও প্রশ্নবিদ্ধ। আমি দায়িত্ব নিয়েই শুনলাম, আইসিটি বিভাগ চার শর বেশি গেমস বানিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কাছে খবর নিয়ে জানলাম, সঠিক সংখ্যা আসলে ১০০।

উপদেষ্টা জানান, বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হলো আইন ও নীতিমালার সংস্কার, সংযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি এবং সাইবার নিরাপত্তা ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা। এর পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিকস খাতে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে চলমান উদ্বেগ নিরসনে তিনি জানান, সরকার সব মহলের মতামত নিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আইনটি প্রণয়নের চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সবার সাথে আলোচনার মাধ্যমেই এর সমাধান খোঁজা হবে। চতুর্থত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, দক্ষ জনশক্তি ও স্টার্টআপের বিকাশ। সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধন নিয়ে সাধারণ নাগরিক ও গণমাধ্যমে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনটি নিয়ে সরকারের ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য নেই। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়গুলোর সমাধান করতে হবে, তারপর আইনটি মন্ত্রিসভায় নিয়ে আসতে হবে। তাই সবার উদ্বেগ ও মতামত আমরা গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত যা হয়েছে, তা আধা ডিজিটাল। সম্প্রতি অনুসন্ধান করে দেখিয়েছে, সরকারের একজন মন্ত্রীও এই ঘটনার শিকার। এ ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা সর্বোচ্চ মাত্রায় বাস্তবায়ন করা দরকার। সাইবার সুরক্ষার ক্ষেত্রে আমার তিনটি পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন সম্পর্কে তিনি বলেন, কেবল অনলাইনে আবেদন গ্রহণ করাই ডিজিটাল সেবা নয়, বরং সেবাপ্রক্রিয়াকে নাগরিকবান্ধব করাই মূল লক্ষ্য। সেবা পেতে এখনো অনলাইনে আবেদন করার পরেও মানুষকে সরকারি দপ্তরে যেতে হয়।

এজন্য সরকার ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি’ উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে, যেখানে একজন নাগরিকের ১২টি মৌলিক তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আপনারা যে পরামর্শ দিচ্ছেন, সেগুলো পর্যালোচনা করে খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছি। এতে নাগরিকের নাম, মা–বাবার নাম, জন্মতারিখ, জন্মস্থান, ঠিকানা ও একটি ইউনিক আইডিসহ ১২টি মৌলিক তথ্য থাকবে। তবে সব জায়গায় আরও কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে।

তথ্যের সমন্বয় ও ই-গভর্ন্যান্স কার্যকর করার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া সরকারি প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে জিওগ্রাফিক্যাল কোডভিত্তিক একটি ড্যাশবোর্ড তৈরির প্রচেষ্টা চলছে।

তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতের গুরুত্ব তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, ভবিষ্যতে এআই-চালিত বিশ্বে তথ্যের সুরক্ষাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি নাগরিকদের ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষায় সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। ব্যাংকিং ও টেলিযোগাযোগ খাত কিছুটা নিরাপদ হলেও ই-কমার্স ও বেসরকারি খাতের ডেটাবেজগুলোর নিরাপত্তা উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বললে ব্যাংক ও টেলিফোন খাত অন্যান্য খাতের তুলনায় কিছুটা নিরাপদ।

টেলিযোগাযোগ খাতের কর কাঠামো প্রসঙ্গে রেহান আসিফ আসাদ বলেন, বাংলাদেশের জিডিপি-কর অনুপাত বর্তমানে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন পর্যায়ের একটি। একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতির জন্য এটি অন্তত ১২ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়। মোবাইল ফোন উৎপাদন শুল্ক ২৬-২৮ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার ফলে বর্তমানে দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মোবাইল ফোনের চাহিদা দেশি উৎপাদনেই পূরণ হচ্ছে। তিনি পিসিবি বোর্ডের নকশা ও উৎপাদন দেশেই করার উপর জোর দেন, যাতে চিপের বাইরের বাকি ৭০ শতাংশ খরচের নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হয়।

টেলিটকের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি জানান, সরকারি এই অপারেটরের মূল সমস্যা নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা। বেসরকারি অপারেটরদের যেখানে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাওয়ার রয়েছে, সেখানে টেলিটকের টাওয়ার রয়েছে মাত্র ৬ হাজার। এই বৈষম্য ঘোচাতে কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কের জাতীয় ডেটা সেন্টারে ১০ হাজার বর্গফুট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং সারা দেশে ৮টি নোড ও ১৬টি সিআরএস স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

টু-জি সেবা বন্ধের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ২০২৯ সালের মধ্যে এটি বন্ধের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ফোর-জি প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চিপ ও যন্ত্রাংশের সরবরাহ সংকটের কারণে ফোনের দাম বাড়ছে। তবে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের হাতে সাশ্রয়ী ফোর-জি ফোন পৌঁছে দেওয়া অপরিহার্য, অন্যথায় তারা এআই ও ক্লাউড সেবার সুফল থেকে বঞ্চিত হবেন। এবারও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে চাই। এসব তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় পাওয়া গেলে সরকারের যেসব দপ্তর সেবা দেয়, তারা সহজেই প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে পারবে।

সার্বভৌম এআই অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের নাগরিকদের তথ্য ও সেবার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই এর মূল লক্ষ্য। বাংলা ভাষায় এআই সক্ষমতা বাড়াতে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) উন্নয়নের কাজ চলছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণার আওতায় আনা হচ্ছে। ভিয়েতনামের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, সঠিক পরিকল্পনায় ইলেকট্রনিকস রপ্তানি ১ বিলিয়ন থেকে কয়েক বছরে ২১৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। সরকার এমন একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে চায়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের ডিজিটাল ও অর্থনৈতিক রূপান্তরে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে নাগরিকদের বিপুল পরিমাণে তথ্য জমা হচ্ছে, কিন্তু বারবার তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটছে।