লন্ডনের রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে সংগীত প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন নাভহান

Published: November 5, 2026, 7:45 am

যুক্তরাজ্যের লন্ডনের বিশ্বখ্যাত রয়্যাল অ্যালবার্ট হলের মঞ্চে গতকাল বুধবার সংগীতের এক জমকালো আসরে অংশ নেয় দেশটির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা মেধাবী কিশোর-তরুণরা। প্রায় পাঁচ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে পিয়ানো নিয়ে মঞ্চে হাজির হয় ১৬ বছর বয়সী ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কিশোর নাভহান উজায়ের রঈস চৌধুরী। সেখানে নিজের রচিত ধ্রুপদি সংগীত পরিবেশন করে বিচারকদের মুগ্ধ করার মাধ্যমে সে ‘ফিউচার মেকার্স ২০২৬’ সংগীত প্রতিযোগিতার চ্যাম্পিয়নের সম্মাননা অর্জন করে। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকেরাও উপস্থিত ছিলেন। যুদ্ধের বিপরীত দুই প্রেমিক-প্রেমিকার গল্পকে সংগীতের মাধ্যমে তুলে ধরে নাভহান। তবে শুধু ধ্রুপদি সংগীতেই তার আগ্রহ সীমাবদ্ধ নয়। ভাষা বা সংগীতের ধরন–নির্বিশেষে সব ধরনের সংগীত তার কাছে উপভোগ্য। প্রতিযোগিতার নিয়ম অনুযায়ী আবেদনকারীকে নিজের রচিত মৌলিক সংগীত জমা দিতে হয়। সিটি অব লন্ডন করপোরেশনের বিনিয়োগ কমিটির বার্ষিক নৈশভোজে তার সেই পরিবেশনা শেষে উপস্থিত অতিথিরা দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান। এই সংগীত দলের জন্য তার রচিত গান যুক্তরাজ্যসহ বিদেশে পরিবেশিত হয়েছে। তাঁর মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর গাওয়া ঘুমপাড়ানি গানের সুর অনুকরণের চেষ্টা করত নাভহান। এই দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে নাভহান ছোট। সাত বছর বয়স থেকে বাংলা, উর্দু ও হিন্দি গান গাইতেন তিনি।

প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপট ও উত্তরণ

২০২২ সালে শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতাটি যুক্তরাজ্যের ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সী তরুণ সংগীতশিল্পীদের জন্য একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। এবারের আসরে হাজারো আবেদনের মধ্য থেকে কঠোর বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চূড়ান্ত ৯ জন প্রতিযোগীকে নির্বাচন করা হয়। নাভহানের মা রুবেনা চৌধুরী জানান, গত মে মাসে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর জুন মাসে অনুষ্ঠিত সরাসরি অডিশনে ২৫ জনের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছিল নাভহান। সেখান থেকেই চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেওয়া প্রতিযোগীদের তালিকায় নিজের অবস্থান নিশ্চিত করে সে। প্রতিযোগীদের বয়স ১৪ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। সেখান থেকে নির্বাচিত নাভহানসহ ৯ প্রতিযোগী চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেন। আট বছর বয়সের দিকে শুরু হয় তার প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতশিক্ষা। তবে নাভহানের জন্মের কারণে তৃতীয় বছরের প্রশিক্ষণ শেষ করতে পারেননি তিনি।

সংগীতের মূল উপজীব্য

প্রতিযোগিতায় নাভহান পরিবেশন করে নিজের রচিত পিয়ানো কম্পোজিশন ‘লা দ্যুল্যর এক্সকিজ’। ফরাসি শব্দগুচ্ছটির অর্থ তীব্র বেদনা। এফ-শার্প মাইনর স্কেলে রচিত এই সুরের মূল বিষয়বস্তু যুদ্ধ ও ভালোবাসা। পিয়ানোয় দুই হাতের বিপরীতধর্মী সুরে সে ফুটিয়ে তোলে সংঘাত ও আবেগের মেলবন্ধন। তার এই সংগীতের মূল বার্তা—ঘৃণা ও ঈর্ষার বিপরীতে ভালোবাসার জয়। ধ্রুপদি সংগীতের রোমান্টিক যুগের প্রতি বিশেষ অনুরাগী নাভহানের অনুপ্রেরণা ফ্রেদেরিক শোপাঁ, সের্গেই রাখমানিনভ ও ফ্রানৎস লিস্ট। তবে জ্যাজ, পপ ও রক ঘরানার সংগীতের প্রতিও তার গভীর অনুরাগ রয়েছে।

পুরস্কার ও পেশাদার সহায়তা

চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে আগামী এক বছর সংগীতশিল্পের পেশাদারদের কাছ থেকে বিশেষ সহায়তা পাবে নাভহান। এর মধ্যে সংগীত প্রযোজনা, রেকর্ডিং, প্রচারণা ও পেশাগত সংগীতজীবন গড়ে তোলার যাবতীয় সুযোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইতিমধ্যে সংগীতশিল্পের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে সে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে।

শিক্ষা ও সংগীতচর্চা

  • নাভহান ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণ করে।
  • বর্তমানে সে যুক্তরাজ্যের ঐতিহ্যবাহী আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হ্যারো স্কুলের শিক্ষার্থী।
  • ১৩ বছর বয়সে সংগীতবৃত্তি পেয়ে এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় সে।
  • হ্যারো স্কুলে পিয়ানো ও চেলো বাদ্যযন্ত্রে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে নাভহান।
  • ইতিমধ্যে সংগীতের সব গ্রেড পরীক্ষায় সে ‘ডিস্টিংশন’ অর্জন করেছে।
  • সে হ্যারো স্কুলের বায়রন কনসোর্ট চেম্বার কয়ার, সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা ও স্ট্রিং অর্কেস্ট্রার সদস্য।
  • গিটার বাজানো ও আধুনিক গান গাওয়ার ক্ষেত্রেও তার বিশেষ পারদর্শিতা রয়েছে।
  • ব্রেন্টউড স্কুলে পড়ার সময় সে সংগীতবৃত্তি পেয়েছিল এবং গিল্ডহল স্কুল অব মিউজিক অ্যান্ড ড্রামাতেও প্রশিক্ষণ নিয়েছে।

পারিবারিক ঐতিহ্য

নাভহানের বাবা মোহাম্মদ চৌধুরী (ভুলন চৌধুরী) দিনাজপুরের সন্তান এবং ১৯৯৪ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। সেটি কণ্ঠসংগীত, যন্ত্রসংগীত কিংবা উভয়ের সমন্বয়ে হতে পারে।

মা রুবেনা চৌধুরীর আদি বাড়ি সিলেটে এবং তিনি ১৯৭৯ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন।

রুবেনা চৌধুরী নিজেও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বর্তমানে খ্যাতিমান শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে উভয় বাদ্যযন্ত্রে ডিপ্লোমা পর্যায়ের যোগ্যতা অর্জনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সে।

নাভহানের সংগীতের প্রতি আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই।

মাত্র ১৩ বছর বয়সে লন্ডনের ড্রেপার্স হলে নিজের রচিত সংগীত পরিবেশন করে সে প্রথমবার আলোচনায় আসে।

প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী মাহমুদুন্নবী এবং গীতিকার কাওসার আহমেদ চৌধুরী ছিলেন নাভহানের বাবার ফুফা।

এই পারিবারিক সংগীতের আবহই তাকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

পড়াশোনাতেও অত্যন্ত মেধাবী নাভহানের রয়েছে ‘পারফেক্ট পিচ’ শনাক্ত করার বিশেষ দক্ষতা। সংগীতের পাশাপাশি বিজ্ঞানভিত্তিক ক্যারিয়ারে আগ্রহী বড় বোনের সংগীতচর্চাও তাকে শৈশব থেকে উদ্দীপ্ত করেছে।