ফ্রান্সে শ্রমিক-শিক্ষার্থী বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে গ্রেপ্তার ৪৪৮

Published: November 6, 2026, 2:25 am

ফ্রান্সজুড়ে শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের ব্যাপক বিক্ষোভে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে বিভিন্ন শহর। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি স্থবিরতা এবং সরকারি পরিষেবায় বিনিয়োগের দাবিতে ডাকা এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্যারিসসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের তীব্র সংঘর্ষ হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে টিয়ার গ্যাস ছুড়তে হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দিনব্যাপী এই অস্থিরতায় দেশজুড়ে ৪৪৮ জনকে আটক করা হয়েছে এবং সংঘর্ষে ৫৩ জন পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য আহত হয়েছেন। বিশৃঙ্খলা এড়াতে সারা দেশে ৭০ হাজার নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন ছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ আগেই কঠোর অবস্থানের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানী প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। দিনের কর্মসূচি ঘিরে দেশজুড়ে ৪৪৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিছু স্থানে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলার ঘটনাও ঘটেছে।

বিক্ষোভের অংশগ্রহণ নিয়ে সরকারি ও আয়োজকদের তথ্যে বড় ধরনের অমিল দেখা গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশজুড়ে ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন। অন্যদিকে, শ্রমিক সংগঠন সিজিটি (CGT) দাবি করেছে, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ১৫ লাখ ৭৩ হাজারের বেশি। প্যারিসের চিত্র ছিল সবচেয়ে উত্তপ্ত; প্লাস দ্য লা রিপাবলিক থেকে প্লাস দ্য লা নাসিওঁ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ মিছিলের এক পর্যায়ে বিকেলের দিকে বুলেভার্ড ভলতেয়ার এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসাকর্মীদের অন্তত তিন তরুণের মাথায় আঘাত পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া লিয়োঁসহ অন্যান্য শহরেও ভাঙচুর ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার প্যারিসের বিখ্যাত আইফেল টাওয়ারও বন্ধ রাখা হয়েছিল। সরকারি ও আয়োজকদের পরিসংখ্যানে বড় ধরনের পার্থক্য থাকলেও উভয় হিসাবেই বিপুলসংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়টি উঠে এসেছে। স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসাকর্মীরা ঘটনাস্থলে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। এর মধ্যে প্যারিসে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ৬৫ হাজার। অন্যদিকে সিজিটির হিসাবে, ফ্রান্সজুড়ে ১৫ লাখ ৭৩ হাজারের বেশি এবং প্যারিসে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন।

আন্দোলনের মূল কেন্দ্রে রয়েছে মজুরি বৃদ্ধি, ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার মতো দাবিগুলো। শ্রমিকদের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে শিক্ষার্থীরাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও মানোন্নয়নের দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছেন। এছাড়া শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারীদের একাংশ কর্মবিরতিতে অংশ নেওয়ায় জনজীবনে প্রভাব পড়েছে। এমনকি জ্বালানি খাতের ধর্মঘটের কারণে দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ক্রমবর্ধমান এই জনঅসন্তোষ সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু আগামী ৯ নভেম্বর শ্রমিক ও নিয়োগকর্তাদের প্রতিনিধিদের নিয়ে এক বিশেষ সামাজিক সম্মেলনের ডাক দিয়েছেন। মূলত মজুরি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমেই এই সংকট সমাধানের পথ খুঁজবে সরকার। বৃহস্পতিবারের এই বিক্ষোভে বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ ও রাজনীতিক রাফায়েল গ্লুকসম্যানের মতো ব্যক্তিত্বদের অংশগ্রহণ রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকার ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যকার আসন্ন আলোচনার ফলাফলই এখন ফ্রান্সের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।