ইরানের কেশম দ্বীপে আবারও সামরিক অভিযান চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। মূলত প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে সোমবার (২ নভেম্বর) এই হামলা চালানো হয়। যদিও মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ ঠিক কী ধরনের তাৎক্ষণিক হুমকির মুখে এই পদক্ষেপ নিয়েছে, তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেনি। তবে স্থানীয় সূত্র ও ফার্স নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, মঙ্গলবার ভোরেও দ্বীপটিতে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। কেনই বা এখানে একের পর এক হামলা চালায় তারা। তবে ঠিক কি ধরণের হুমকিতে ছিল আমেরিকার সেনারা, তা নিশ্চি করে বলেনি। ওই অভিযানে দ্বীপে তিনজন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছিল ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপটি দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মিলনস্থলে অবস্থিত কেশম দ্বীপটি হরমুজ প্রণালির প্রবেশপথে অবস্থিত। এই প্রণালিটি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান পথগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখান দিয়ে যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো। ফলে এই এলাকায় প্রভাব বিস্তার করা উভয় পক্ষের জন্যই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এর প্রধান কারণ দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থান। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
ওয়াশিংটন পোস্ট ও সিএনএনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মতে, কেশম দ্বীপে ইরানের বিশাল ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, নৌ-অবকাঠামো এবং উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা রয়েছে। এসব স্থাপনা ব্যবহার করে ইরান হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক চাপ বজায় রাখছে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্বীপটির এই সামরিক সক্ষমতা ধূলিসাৎ করতে পারলে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করা মার্কিন বাহিনীর জন্য সহজ হবে। ইরান এই নৌপথকে নিজেদের কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
এর আগে জুলাই মাসেও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) কেশম দ্বীপে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করেছিল।
ওই হামলায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ড্রোন স্থাপনা, কমান্ড সেন্টার এবং নৌ-সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হয়। তেহরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন শুরুর পর বহুবার এই ছোট দ্বীপটি লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কেশম দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, সেই অভিযানে অন্তত তিনজনের প্রাণহানি ঘটেছিল। তবে এবারই প্রথম নয়, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগেও বেশ কয়েকবার গোপনে দ্বীপটিতে হামলা চালানো হয়েছে, যার তথ্য তখন প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে, উভয় দেশের মধ্যে যখন কূটনৈতিক আলোচনার আভাস মিলছে, তখনই এমন হামলার ঘটনা ঘটল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তেহরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য চুক্তির পথ তৈরি হচ্ছে। তবে এই আলোচনার পাশাপাশি সামরিক সংঘাতও সমান তালে চলছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, সামরিক হুমকির কাছে ইরান মাথা নত করবে না। একইসঙ্গে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি সতর্ক করেছেন যে, বড় ধরনের যেকোনো আগ্রাসনের কঠোর জবাব দেওয়ার জন্য তারা প্রস্তুত। সব মিলিয়ে কেশম দ্বীপকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সমাধান এখনো অধরা রয়ে গেছে।








