ঢাবি স্নাতকোত্তরে প্রথম হয়ে স্বর্ণপদক পেলেন সাতক্ষীরার হান্নান

Published: November 5, 2026, 7:06 am

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের আবদুল হান্নান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর পরিচিতি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চান। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই তিনি নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে খরচ চালিয়েছেন। অবশেষে কঠোর পরিশ্রমের ফসল হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় সিজিপিএ-৪ পেয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন তিনি। এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে ড. মোহাম্মদ আতহার উদ্দিন স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়েছে। হান্নানের কাছে এই পদক শুধু ভালো ফলের স্বীকৃতি নয়, দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণের পথে বড় এক অর্জন। সাফল্যের খবরটি তিনি ভিডিও কলে প্রথমেই মাকে জানিয়েছিলেন।

দুই ভাইয়ের অদম্য মেধাবী লড়াই

হান্নানের গ্রামের বাড়ি শ্যামনগরের রুদ্রপুর গ্রামে। তাঁর যমজ ভাই আবদুল মান্নানও মেধাবী। ছোটবেলা থেকেই তাঁরা নানা-নানি ও মামাদের কাছে বড় হয়েছেন। ভুরুলিয়া সিরাজপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ার সময় থেকেই এসএসসিতে জিপিএ-৫ এবং এইচএসসিতেও ভালো ফল করেন। স্কুলের শিক্ষকরাও তাঁদের অনেক সহযোগিতা করেছেন। ২০১৬ সালে এসএসসি পাসের পর দুই ভাই ব্র্যাক ব্যাংক ও ট্রাস্টের অদম্য মেধাবী শিক্ষাবৃত্তির জন্য মনোনীত হন, যা তাঁদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পথে বড় সহায়তা হিসেবে কাজ করে।

স্বপ্ন জয়ের যৌথ পথচলা

২০১৮ সালে এইচএসসি পাসের পর দুই ভাইয়ের লক্ষ্য হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। তাঁরা একসঙ্গে বই কিনতেন এবং পড়া বুঝতে না পারলে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতেন। ২০১৯ সালে হান্নান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও মান্নান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যক্রমে মিল থাকায় পড়াশোনার প্রয়োজনে তাঁরা একে অপরকে ছবি পাঠিয়ে বা আলোচনার মাধ্যমে সাহায্য করতেন।

শিক্ষাজীবন ও সংগ্রামের চিত্র

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিজের খরচ জোগাতে হান্নানকে নিয়মিত টিউশনি করতে হয়েছে। কখনো কখনো একসঙ্গে তিন-চারটি টিউশনি সামলাতে হয়েছে তাঁকে। হলে গণরুমে গাদাগাদি করে থাকার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই তিনি স্নাতকে ৩ দশমিক ৯৫ সিজিপিএ পেয়ে পঞ্চম এবং স্নাতকোত্তরে সিজিপিএ-৪ পেয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। অন্যদিকে, মান্নানও তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে বর্তমানে বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

আবদুল মান্নান জানান, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁরা একে অপরকে সহযোগিতার মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। বর্তমানে হান্নান ঢাকার শেখ বোরহানউদ্দিন পোস্টগ্র্যাজুয়েট কলেজে পরিবেশবিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। তিনি বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার জন্য আবেদন করছেন এবং সুযোগ পেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা করতে চান। নিজের বেতনের টাকা থেকে মাকে নিয়মিত সহায়তা করেন এবং ভবিষ্যতে মাকে নিজের কাছে রেখে দেখাশোনা করার স্বপ্ন দেখেন তিনি।

শিক্ষায় ট্রাস্টের ভূমিকা

  • ২০১৬ সালে ব্র্যাক ব্যাংক ও ট্রাস্টের শিক্ষাবৃত্তি দুই ভাইয়ের জন্য বড় সাহস ও সহায়তার উৎস ছিল।
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষকের প্রতিও হান্নান কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
  • হান্নানের জীবনের সবচেয়ে বড় গৌরবের জায়গা এই স্বর্ণপদক।
  • মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারাই হান্নানের কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দ।

পরিশেষে, দুই ভাইয়ের এই সাফল্য অদম্য জেদ ও পরিশ্রমের অনন্য উদাহরণ। হান্নানের এই স্বর্ণপদক কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও পারিবারিক স্বপ্নের সার্থক পরিণতি। নিজের লক্ষ্য পূরণে নিরলস পরিশ্রম করে যাওয়ার যে দৃঢ় সংকল্প তিনি করেছিলেন, তা আজ বাস্তবে রূপ পেয়েছে। ভবিষ্যতে শিক্ষক হিসেবে নিজের জ্ঞান দিয়ে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখাই এখন তাঁর বড় লক্ষ্য।