সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চাকরির পরীক্ষা গ্রহণের পর নিয়োগের জন্য যোগ্য প্রার্থীদের সুপারিশ করে থাকে। তবে অতীতে দেখা গেছে, পিএসসির সুপারিশ পাওয়ার পরেও মন্ত্রণালয় অনেক সময় পুলিশ ভেরিফিকেশনের অজুহাতে অকারণে প্রার্থীদের চাকরি থেকে বঞ্চিত করেছে। বিশেষ করে ২৮তম থেকে ৪১তম বিসিএস পর্যন্ত প্রায় ২৬৫ জন প্রার্থীকে একইভাবে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। তাঁদের বিরুদ্ধে নেওয়া তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্তগুলো ছিল নিয়মবহির্ভূত ও হয়রানিমূলক। সরকারি চাকরিতে অযোগ্য হওয়ার মতো কোনো কারণ ছাড়াই তাঁদের এই নিয়োগ বাতিল করা হয়েছিল। যেমন ২৫তম বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি আগে প্রকাশিত হয়। পিএসসির অধীন আমার দুবার চাকরি হয়েছিল। আমি নিজেও বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা ছিলাম। ফলে আমি কাছে থেকে দেখেছি এখানে কী হয়। রাষ্ট্রীয় পক্ষপাতমূলক এসব সিদ্ধান্ত ছিল নিয়মবহির্ভূত। ভূতাপেক্ষ অভিজ্ঞতা না দিলে এসব কর্মকর্তা খুব বেশি পদোন্নতিও পাবেন না। দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকর্তাকে সীমাহীন কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার নিয়োগবঞ্চিত সেই ২৬৫ জন প্রার্থীকে চাকরিতে যোগদানের সুযোগ করে দেয়। তবে তাঁদের নিয়োগপত্রে জ্যেষ্ঠতা নিয়ে যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশাসন ক্যাডারের ২৮তম থেকে ৪১তম বিসিএসের ২৩ জন কর্মকর্তা সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর একটি আবেদনপত্র দিয়েছেন। সেখানে তাঁরা দাবি করেছেন, ভূতাপেক্ষভাবে তাঁদের জ্যেষ্ঠতা বজায় রাখতে হবে। এই বিধিসম্মত বিষয়টি ২৮ থেকে ৪১তম বিসিএস পর্যন্ত প্রশাসন ক্যাডারের ২৩ জনের জন্য প্রযোজ্য হবে না।
আবেদনপত্রের তথ্যানুযায়ী, গত ১৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের অনুচ্ছেদ ২ অনুযায়ী, এই কর্মকর্তারা পহেলা সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করেন। প্রজ্ঞাপনের (ছ) উপানুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের জ্যেষ্ঠতা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে তাঁদের মূল ব্যাচের নিয়োগ প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে ভূতাপেক্ষভাবে নিয়োগ আদেশ কার্যকর হবে। এর ফলে তাঁদের মূল ব্যাচের সমসাময়িক জ্যেষ্ঠতা বজায় থাকবে, যদিও তাঁরা কোনো বকেয়া আর্থিক সুবিধা দাবি করবেন না। অতীতে বাদ পড়া কর্মকর্তাদের জন্য ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের শর্তের কথা উল্লেখপূর্বক আবেদনপত্রে লেখা হয়েছে, ‘প্রজ্ঞাপনের অনুচ্ছেদ ২ অনুযায়ী ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ আমরা বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে যোগদান করি। ২০১০ সালে যোগদান করেছেন ২৮তম বিসিএস পরীক্ষার্থীরা।
চাকরির নিয়মানুযায়ী, একজন প্রার্থী পরে যোগদান করলেও যে ব্যাচের পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হয়েছেন, সেই ব্যাচেই তাঁর জ্যেষ্ঠতা গণ্য হওয়ার কথা। অতীতেও এমন নজির রয়েছে যে, ভিন্ন ব্যাচের পরীক্ষা আগে শেষ হওয়ায় বা বিজ্ঞপ্তি আগে আসায় প্রার্থীরা জ্যেষ্ঠতা পেয়েছেন। বর্তমানের এই ২৩ কর্মকর্তা তাই আশঙ্কা করছেন, যদি ২০২৪ সাল থেকে তাঁদের চাকরিকাল গণনা করা হয়, তবে তাঁদের কর্মজীবনের দীর্ঘ মেয়াদে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। ওই বিসিএসে নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীর চাকরিকাল যদি ২০২৪ সাল থেকে গণনা করা হয়, তাহলে নিয়ম লঙ্ঘন হবে। ব্যাচভিত্তিক জ্যেষ্ঠতা পাওয়া একজন ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তার অধিকার।
যদি ২০২৪ সাল থেকেই চাকরিকাল গণনা করা হয়, তবে তাঁদের অনেকেরই চাকরিতে ২৫ বছর পূর্ণ হবে না। এর ফলে সচিব পদ পর্যন্ত পৌঁছানো তো দূরের কথা, অনেককে উপসচিব পদ থেকেই অবসরে যেতে হবে। এটি কেবল ওই ২৩ কর্মকর্তার ক্ষেত্রেই নয়, বরং ভেরিফিকেশনের নামে বঞ্চিত ২৬৫ জনের ক্ষেত্রেই অভিন্ন নীতিতে কার্যকর হওয়া উচিত। দীর্ঘ সময় ধরে আদালতে এবং মন্ত্রণালয়ের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তাঁরা সুবিচার পাননি। তাঁরা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই এই চাকরি অর্জন করেছিলেন, কোনো প্রশ্নপত্র ফাঁস বা দুর্নীতির মাধ্যমে নয়। ১৫ বছর আগের কথা। তাঁরা কেউ দুর্নীতি করে চাকরি নেননি, তাঁরা কেউ প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত নন, কেউ করুণা চাইতে আসেননি।
রাষ্ট্রের উচিত বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা। সরকার চাইলে তাঁদের মূল ব্যাচের সমসাময়িক তারিখ থেকে বেতন-ভাতা কার্যকর করতে পারে এবং সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করা যুক্তিযুক্ত। অতীতে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বিভিন্ন পদোন্নতিবঞ্চিত বিসিএস কর্মকর্তাদের কয়েক দিনের ব্যবধানে তিনটি পর্যন্ত পদোন্নতি পেতে দেখা গেছে। যদি সেই সুযোগ দেওয়া সম্ভব হয়, তবে ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের ভূতাপেক্ষ জ্যেষ্ঠতা দিতে সমস্যা কোথায়?
এই পুরো প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী প্রার্থী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মানসিক যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা রাষ্ট্রকে অনুধাবনে আনতে হবে। তাঁরা কোনো করুণা ভিক্ষা করছেন না, বরং বিধিসম্মত অধিকারের দাবি জানাচ্ছেন। এই বিষয়টি দ্রুত সুরাহা না করলে ভবিষ্যতে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।








