একসময় তাঁদের পারিবারিক ব্যবসার মূল ভিত্তি ছিল ঘি। সময়ের প্রবাহে সেই ব্যবসায়িক পরিধি বিস্তৃত হয়েছে, আর ঘিয়ের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁরা এখন মিষ্টির জগতে এক সুপরিচিত নাম। দুধ, ছানা, ক্ষীর ও চিনির নিখুঁত মিশেলে তৈরি হচ্ছে নানা স্বাদের মিষ্টান্ন। মুন্সিগঞ্জের বালাশুরে পারিবারিক পূজার আয়োজনে গিয়ে দেখা যায়, ঘি দিয়ে শুরু হওয়া বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের এই দীর্ঘ যাত্রায় এখন যুক্ত হয়েছে প্রায় ১৮৫ ধরনের মিষ্টি। সারা দেশে প্রতিষ্ঠানটির ৪৫টি শাখা ছড়িয়ে রয়েছে। প্রতিটি মিষ্টির জন্য প্রয়োজন হয় আলাদা দক্ষতা। কোথাও ছানাকে নির্দিষ্ট ঘনত্বে আনতে হয়, কোথাও ক্ষীর তৈরি করতে হয় যত্ন নিয়ে, আবার কোথাও নিশ্চিত করতে হয় রসের সঙ্গে মিষ্টির সঠিক সমন্বয়।
পরিবারের বর্তমান পরিচালকদের একজন দীপক কুমার ঘোষ জানান, ব্রিটিশ আমলে পূর্বপুরুষেরা ঘিয়ের ব্যবসা করতেন। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের সঙ্গে তাঁদের এই দীর্ঘদিনের সম্পর্কের সূত্র ধরেই মিষ্টি তৈরির পরিকল্পনা আসে। আদি দোকানটির নাম ছিল ‘দেশপ্রিয় মিষ্টান্ন ভান্ডার’, যা পুরান ঢাকায় গড়ে উঠেছিল। তখন দোকানটির সকালের নাশতা বেশ জনপ্রিয় ছিল এবং বিশেষ ধরনের ‘প্রাণহরা’ মিষ্টি ছিল গ্রাহকদের প্রধান আকর্ষণ। সাগরকলা দিয়ে তৈরি সেই বিশেষ মিষ্টির প্রস্তুতপ্রণালির কারিগরেরা এখন আর বেঁচে নেই, যার ফলে সেই ঐতিহ্যবাহী স্বাদ ফিরিয়ে আনা এখন বেশ চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু সেই সমন্বয়কে সঠিক স্বাদ ও গঠনে রূপ দেন কারিগরেরা।
পরবর্তীতে ১৯৮১ সালে প্রয়াত রমেশচন্দ্র ঘোষের উদ্যোগে যাত্রা শুরু হয় ‘বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার’। বর্তমানে পরিবারের ২৪ সদস্য সম্মিলিতভাবে পুরো ব্যবসাটি পরিচালনা করছেন। প্রমিত কুমার ঘোষ জানান, চার প্রজন্ম ধরে এই ব্যবসায়িক ঐতিহ্য ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা পরের প্রজন্মের ধারণ করার কারণে। যদিও আধুনিকায়নের ছোঁয়া লেগেছে, তবুও পারিবারিক বন্ধনই এই প্রতিষ্ঠানের মূল ভিত্তি হয়ে টিকে আছে।
বর্তমানে এখানে ১৮৫ ধরনের মিষ্টান্ন তৈরি হয়। এর মধ্যে রসগোল্লা, কালোজাম, চমচম ও ক্ষীর চমচমের মতো জনপ্রিয় মিষ্টি সারা বছর পাওয়া যায়। তবে কিছু মিষ্টি রয়েছে যা ঋতুভেদে তৈরি করা হয়। প্রমিত কুমারের ভাষ্যমতে, কমলাভোগ তৈরির সময় নিজস্ব প্রস্তুতপ্রণালি অনুসরণ করা হয়। কমলার খোসা বেটে ছানার সঙ্গে মিশিয়ে কেবল মৌসুমেই এটি তৈরি করা হয়। একইভাবে শীতকালে ক্ষীর কদমের চাহিদা বাড়ে এবং পূজা-পার্বণের সময় লাড্ডুর চাহিদা শীর্ষে থাকে। উপকরণের গুণমান ও প্রকৃতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রাখাই তাঁদের এই মৌসুমি মিষ্টি তৈরির মূল লক্ষ্য। এ ছাড়া রসমালাই, সরমালাই, ক্ষীরমালাই, মালাই চপ, ইন্দ্রাণী ভোগ, জাফরানি ভোগ ও কাশ্মীরি চমচমের মতো মিষ্টিও তৈরি করা হয়। এত বৈচিত্র্যের মধ্যেও কিছু মিষ্টি রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে ঋতুর সম্পর্ক গভীর। কমলাভোগ তাই শুধু একটি মিষ্টি নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট ঋতুর স্বাদকে ধরে রাখার প্রচেষ্টা।
মিষ্টির স্বাদ অনেকটা দুধের মান, ছানার ঘনত্ব ও চিনির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। মুন্সিগঞ্জ থেকে দুধ, ছানা ও ক্ষীরের মতো কাঁচামালগুলো ঢাকার কলাবাগান ও ইংলিশ রোডের কারখানায় আনা হয়। প্রমিত কুমার ঘোষ নিশ্চিত করেছেন যে, মিষ্টি তৈরিতে কোনো ধরনের প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয় না। তবে ড্রাগন সুইটস, অরেঞ্জ লাড্ডু ও কমলাভোগের মতো কয়েকটি মিষ্টিতে খাবারের রং ব্যবহার করা হয়। তিনি জানান, চিনির পরিমাণ বাড়ালে মিষ্টির স্থায়িত্ব কিছুটা বৃদ্ধি পায়, তবে আসল রহস্য হলো কাঁচামালের মান ও তৈরির পরিচ্ছন্নতা। মিষ্টির ধরন অনুযায়ী এলাচি, দারুচিনি, জায়ফল, জয়ত্রী, লবঙ্গ ও চিনি ব্যবহার করা হয়। তিনি জানান, ড্রাগন সুইটস ও মাল্টি লাড্ডুতে ফুড রেড কালার ব্যবহার করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে সব মিলিয়ে প্রায় তিন শ কর্মী কর্মরত, যাদের মধ্যে শতাধিক কারিগর মিষ্টি তৈরির দক্ষতায় নিয়োজিত। অভিজ্ঞ কারিগরদের হাতের জাদুই প্রতিটি মিষ্টিকে অনন্য করে তোলে। এই কারিগরি জ্ঞান সংরক্ষণ করা এখন প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এদিকে ব্যবসার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বও বেড়েছে। ৪৫টি শাখায় একই স্বাদ ও গুণমান বজায় রাখা এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এখন তাঁদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই বিস্তার একদিকে প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি ও ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে বাড়াচ্ছে দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ।
তবে এই অগ্রযাত্রার পথে নতুন প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিয়েছে নকল মিষ্টির উপদ্রব। প্রমিত কুমার ঘোষ অভিযোগ করেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী নকল পণ্য বিক্রি করছেন। এ ধরনের প্রায় ৩০০টি ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টির ধারা বজায় রেখে নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা এবং পুরোনো প্রস্তুতপ্রণালিগুলো হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করাই এখন বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের আগামীর মূল পরিকল্পনা। এমন প্রায় ৩০০ ঘটনা শনাক্ত করেছেন তাঁরা।








