রাজধানীর কাজীপাড়ায় বসবাসরত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার ওয়াসিউর রহমান। তাঁর অধীনে কাজ করেন অন্তত ২০ জন কর্মী। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকে নিয়মিত ঢাকার রাস্তায় ঘুরতে হয়, গ্রাহকদের সঙ্গে বৈঠক করতে হয় এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তদারকি করতে হয়। কর্মক্ষেত্রের মান ধরে রাখতে পোশাক নির্বাচন, যাতায়াত ও ইন্টারনেটের পেছনে প্রতি মাসে তাঁকে বড় অঙ্কের ব্যক্তিগত খরচ বহন করতে হয়। কিন্তু বছর শেষে যে বেতন পান, তা বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে প্রতি মাসেই হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হয় তাঁকে। প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজের প্রয়োজনে পোশাকের মান বজায় রাখা, যাতায়াত করা এবং সর্বক্ষণ মুঠোফোন ও ইন্টারনেটে সক্রিয় থাকার পেছনে প্রতি মাসে তাঁর পকেট থেকে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়। তিনি জানান, লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় টানা যাতায়াত এবং দুপুরে বাইরে খাওয়ার পেছনেই তাঁর বেতনের একটি বড় অংশ চলে যায়। সব হিসাব শেষে দেখা যাচ্ছে, বছরে দেড় হাজার টাকা করে নিয়ম মেনে ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার পরও ওই কর্মীর প্রতি মাসে বাস্তব ঘাটতি থেকে যাচ্ছে অন্তত ২ হাজার ৯০০ টাকা। ইনক্রিমেন্টের খাতা ইতিবাচক দেখালেও কেনাকাটার বাজারে গিয়ে কর্মী প্রতিদিন এই আয়ের ঘাটতি টের পাচ্ছেন। বেসরকারি খাতে নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রীয় বেতনকাঠামো না থাকায় কোম্পানিভেদে বেতনের তফাত বিশাল। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, সংকটের ব্যাপ্তি এখন আর নির্দিষ্ট কোনো পদে সীমাবদ্ধ নেই।
ওয়াসিউর রহমানের মতো দেশের কোটি কোটি বেসরকারি চাকরিজীবী আজ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় ও চাকরির নিজস্ব বাড়তি খরচের চাপে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছে। এই আর্থিক সংকটের মূল কারণ হিসেবে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতিকে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। গত কয়েক বছর ধরে আয়ের তুলনায় ব্যয় বৃদ্ধির গতি অনেক বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বিসিএসে ‘রিপিট ক্যাডার’ বন্ধে যে উদ্যোগ পিএসসির, ৫০তম থেকেই মিলতে পারে সুফল। কয়েক বছর ধরে সাধারণ মানুষের আয় যে গতিতে বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে তার চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্যমতে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, কেন সাধারণ মানুষ উপার্জনের চেয়ে খরচের চাপে বেশি দিশাহারা। মাঠপর্যায়ে কাজ করা কর্মীদের অবস্থা আরও শোচনীয়; উত্তরায় একটি বায়িং হাউসে জুনিয়র কর্মী হিসেবে কাজ করা সোহেল রানা জানান, লক্ষ্যমাত্রা পূরণে তাঁকে রোদে-বৃষ্টিতে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে হয়, যার যাতায়াত ভাতা প্রকৃত খরচের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। সহজ কথায়, উপার্জনের তুলনায় নিত্যদিনের খরচের বাড়বাড়ন্তই সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলছে।
গত পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে বেসরকারি খাতের এই সংকট আরও স্পষ্ট হয়।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১–২২ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা ২০২২–২৩ অর্থবছরে ৯ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১০ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে পৌঁছায়।
সর্বশেষ ২০২৬ অর্থবছরে এটি ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে গত পাঁচ বছরে সাধারণ জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫২ শতাংশ। সহজ হিসেবে, পাঁচ বছর আগে যে জীবনযাত্রার জন্য ২০ হাজার টাকা লাগত, আজ তার জন্য প্রয়োজন ৩০ হাজার ৪০০ টাকা। অথচ ইনক্রিমেন্টসহ গড়ে বেতন বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কর্মীরা প্রতি মাসে বড় ধরনের ঘাটতির মুখোমুখি হচ্ছেন। এর সরল হিসাব হলো—পাঁচ বছর আগে একজন কর্মী যে পণ্য ও সেবা ২০ হাজার টাকায় কিনতে পারতেন, আজ একই জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে তাঁর লাগছে প্রায় ৩০ হাজার ৪০০ টাকা। সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি, বেতন প্রায় দেড় লাখ টাকা। কানাডায় পিএইচডি শিক্ষার্থীদের জন্য ৮ হাজার ২০০ কোটি টাকার বৃত্তি, পাবেন ৫০ জন।
বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চড়া মূল্যস্ফীতি সাধারণ পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতিও থমকে গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিরপুরের এক প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা জানান, করপোরেট পরিবেশ বজায় রাখার খরচ ছাড়াও মা-বাবার চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার খরচ মেটাতে গিয়ে মাস শেষে কোনো সঞ্চয় থাকছে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশে অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির পেছনে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত ব্যর্থতা বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বজুড়ে সংকটের সময় অন্যান্য দেশ কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করলেও বাংলাদেশে টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক বাঁচানো এবং ক্রমাগত বাজেটের আকার বড় করার নীতি নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান মাত্র ১০ শতাংশ হওয়ায় অতিরিক্ত শ্রমিকের যোগানের সুযোগ নিয়ে মালিকপক্ষ নামমাত্র বেতন বৃদ্ধি করছে। পর্যাপ্ত দেশি–বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়াতে পারলেই কেবল চাকরিজীবীদের দর–কষাকষির শক্তি তৈরি হবে।
এই সংকট মোকাবিলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সানেমের গবেষণা পরিচালক মাহতাব উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে সুদের হার ও রেপো বাড়িয়ে কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া সরকারের অনাবশ্যক বড় প্রকল্প বন্ধ করা, আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের শুল্ক ১০০ শতাংশ থেকে ৫–১০ শতাংশে নামানো এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো জরুরি। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ন্যূনতম মজুরি, বাধ্যতামূলক বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুবিধা দিলে কর্মীদের দর-কষাকষির সক্ষমতা বাড়বে বলে তিনি মনে করেন। তিনি প্রতিবছর গড়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা (প্রতিষ্ঠানভেদে কমবেশি হতে পারে) করে ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন। ফলে তাঁর বর্তমান মূল বেতন দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৫০০ টাকা।








