জামিয়া মিল্লিয়ায় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি, তবুও থামছে না বিক্ষোভ

Published: October 26, 2026, 9:23 am

ভারতের দিল্লির সংখ্যালঘু কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়ায় দীর্ঘদিনের আন্দোলনের মুখে অবশেষে নতি স্বীকার করেছে কর্তৃপক্ষ। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মাহতাব আলম রিজভী ঘোষণা করেছেন যে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সাময়িক বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়েও ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে কর্তৃপক্ষের এই আশ্বাসেও সন্তুষ্ট হতে পারেননি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাঁরা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের ছাত্র–ছাত্রীও আছেন। নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কির পর অনশনরত শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ‘গুলস্তাঁ-ই-গালিব’ ভবনে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের ঘোষণাটি বিভ্রান্তিকর এবং এর কোনো লিখিত রূপ নেই। ১২ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে কেবল ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিই নয়, বরং নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা, প্রধান প্রক্টর ও নিরাপত্তা উপদেষ্টার অপসারণ এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিলের দাবিও তুলেছেন তাঁরা। গত শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ নম্বর গেটের সামনে শিক্ষার্থীদের ব্যানার ও তাঁবু সরানোর চেষ্টাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা মানবশৃঙ্খল গড়ে তুলে তীব্র প্রতিরোধ জানান। ছাত্র–ছাত্রীর সঙ্গে পুলিশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তারক্ষীদের সংঘর্ষের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে। অন্যদিকে প্রশাসন ইতিমধ্যেই তিন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারসহ বেশ কিছু আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।

পরিস্থিতি সামলাতে কর্তৃপক্ষ গত শনিবার থেকে ক্যাম্পাসে ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে আটকা পড়া শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ নেই এবং বাইরে থেকে খাবার আনার সুযোগও বন্ধ। অনশনরত পাঁচজন শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাঁদের হাসপাতালে নেওয়ার কোনো চেষ্টায় বাধা দিচ্ছেন আন্দোলনকারীরা। শিক্ষার্থীদের ছাত্রত্ব সাময়িক বাতিল করার যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তা–ও পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত কলকাতার একাধিক শিক্ষার্থী এই প্রতিবেদককে বলেন, ক্যাম্পাসের ভেতরে থাকা ছাত্র–ছাত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের ভেতরেই আটকে দেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পাসে প্রচুর পুলিশও মোতায়েন করা হয়েছে। অনশনরত অসুস্থ শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে নিতে দুটি অ্যাম্বুল্যান্স ডাকা হলেও শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে সেই চেষ্টা সফল হয়নি।

ক্যাম্পাসে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিক্ষক ও কর্মীদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়েও ভিন্নমত রয়েছে। শুক্রবার কংগ্রেস নেতা ইমরান প্রতাপগড়ী ও ইমরান মাসুদ শিক্ষার্থীদের সমর্থনে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে পুলিশ তাঁদের আটক করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, বহিরাগত রাজনৈতিক উপস্থিতির কারণে ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে ‘ফ্রি কাশ্মীর’ ও ‘ফ্রি শারজিল ইমাম’ লেখা গ্রাফিতিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। শিক্ষার্থীরা এর দায় অস্বীকার করে এটিকে আন্দোলনকে কলঙ্কিত করার চক্রান্ত বলে অভিহিত করেছেন, যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একে ঐতিহ্যের জন্য হুমকি হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে। তবে এ কারণে দুই সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন স্তিমিত হবে না বলে তাঁদের সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এরপর বিক্ষোভের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পায়।

১৯২০ সালে উত্তর প্রদেশের আলিগড়ে প্রতিষ্ঠিত জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া ১৯৩৫ সালে দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয় এবং ১৯৬২ সালে এটি ‘ডিমড’ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে। ২০০৬ সালের পর থেকে এখানে কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। এই দীর্ঘ স্থবিরতা কাটাতে গত ১২ অক্টোবর থেকে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামেন। ১৭ অক্টোবর ভোরে বলপ্রয়োগ করে শিক্ষার্থীদের সরানোর সরকারি উদ্যোগ আন্দোলনকে আরও বেগবান করেছে। এখন দেখার বিষয়, ১৫ দিনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারে কি না। তারপর ১৯৩৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি দিল্লিতে স্থানান্তর করা হয়। এই নির্বাচন এবং অন্য আরও একাধিক দাবির ভিত্তিতে ১২ অক্টোবর থেকে আন্দোলন শুরু করেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র–ছাত্রীরা। ১২ অক্টোবর থেকে প্রায় দুই সপ্তাহ আন্দোলন চলার পর পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত শনিবার থেকে ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। ১৭ অক্টোবর ভোরে আন্দোলনকারীদের বলপ্রয়োগে সরানোর চেষ্টা করে সরকার।