৩৬ দিন পর চুয়েটে সীমিত ক্লাসে ফিরলেও কাটেনি সংকট

Published: October 28, 2026, 9:34 am

দীর্ঘ ৩৬ দিনের চরম অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সীমিত পরিসরে একাডেমিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা হয়েছে। বুধবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের কয়েকটি ব্যাচের পাঠদান অনুষ্ঠিত হয়। তবে ১২টি বিভাগের মধ্যে বাকি ১১টি বিভাগেই শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশ কম। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের ভিন্নমত থাকতে পারে।

একই দিনে চুয়েটের বর্তমান অস্থিরতা ও সংকট নিরসনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বিস্তারিত মতবিনিময় করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) গঠন করা ছয় সদস্যের পরামর্শক কমিটি। সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে সংকট সমাধানের সুনির্দিষ্ট পথ খুঁজে বের করাই এই কমিটির মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে অচলাবস্থা নিরসনে দ্রুত গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত আসবে বলে প্রত্যাশা তাদের।

ক্যাম্পাসের একাডেমিক পরিস্থিতির চিত্র

নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ তালবী জানান, কম সংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাদের রুটিন অনুযায়ী ল্যাব অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তা আপাতত স্থগিত রাখা হয়। বিভাগীয় প্রধান ফৌজিয়া গুলশানা রশিদ লোপা নিশ্চিত করেন যে, ২১, ২২ ও ২৩ ব্যাচের পাঠদান সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে ২১ ও ২২ ব্যাচের উপস্থিতি তুলনামূলক ভালো ছিল। আগামী দিনগুলোতে উপস্থিতি আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করছেন তারা। আলোচনায় উঠে আসা বিষয়গুলো সরকারের উচ্চপর্যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে জানানো হবে বলে তারা আশা করছেন।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাথে পরামর্শক কমিটির বৈঠক

বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চুয়েটের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে শিক্ষকদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে পরামর্শক কমিটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরবর্তীতে দুপুর ১২টার দিকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পৃথক একটি বৈঠকে বসেন কমিটির সদস্যরা। সেখানে আন্দোলনরত পক্ষগুলো তাদের সুনির্দিষ্ট দাবির কথা কমিটির কাছে সরাসরি তুলে ধরে।

আন্দোলনের কারণ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবি

গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হলে তার পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষার্থীরা কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচির ঘোষণা দেন। শিক্ষার্থীরা সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনরায় বহালের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী গোলাম মুর্শেদ রাতুল জানান, তাদের অনড় অবস্থানের কথা ইউজিসি কমিটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। তুলনামূলকভাবে ২১ ও ২২ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা বেশি উপস্থিত ছিলেন। গত ২১ সেপ্টেম্বর নতুন উপাচার্য নিয়োগের পর থেকেই প্রতিবাদে নামেন চুয়েটের শিক্ষার্থীরা। ক্লাস শুরু হলেও উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকটের সমাধান হয়নি।

স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক রাশিদুল হাসান জানান, শিক্ষক সমিতি ও সাধারণ শিক্ষকদের পক্ষ থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতির পুরো প্রেক্ষিত তুলে ধরা হয়েছে। মৌখিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি একটি লিখিত নথিও কমিটির কাছে হস্তান্তরিত করা হয়েছে, যা সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে শিক্ষকরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ছাত্রদলের মতামত প্রকাশ

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নির্ধারিত আলোচনা শেষে পরামর্শক কমিটির কাছে নিজেদের অভিমত জানান জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের চুয়েট শাখার নেতৃবৃন্দ। সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হোসাইনের নেতৃত্বে ৬-৭ জন সদস্য বৈঠকে অংশ নেন। ওয়াসিফ রাশেদ বলেন, উপাচার্য নিয়োগ একটি রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। তবে দীর্ঘ দিন শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া উদ্বেগজনক। পাশাপাশি বিভিন্ন একাডেমিক গ্রুপ থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়ার অভিযোগও তারা কমিটির সামনে তুলে ধরেন।

ইউজিসি কমিটির বক্তব্য ও গঠন

পরামর্শক কমিটির প্রধান এবং ইউজিসির সম্মানিত সদস্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ-আল-মামুন জানান, সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে একটি যৌক্তিক সমাধানের পরামর্শ সরকারকে দিতেই তারা ক্যাম্পাসে এসেছেন। প্রথম দিনে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মতামত নেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তীতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গেও কথা বলা হবে।

ছয় সদস্যের এই কমিটিতে সদস্যসচিব হিসেবে কাজ করছেন ইউজিসির অতিরিক্ত পরিচালক মো. মহিবুল আহসান। কমিটিতে আরও সদস্য হিসেবে রয়েছেন বুয়েট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সিভাসু-র মাননীয় উপাচার্যবৃন্দ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয় অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী। চুয়েটের সকল পক্ষ এখন ইউজিসির এই কমিটির পরবর্তী সুপারিশ ও পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে আছে।