কেমব্রিজের ক্রাইস্টস কলেজে রহস্যময় ছায়া: শতবর্ষের প্রেম ও ঈর্ষার গল্প

Published: November 1, 2026, 10:59 am

ইংল্যান্ডের হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে অসংখ্য ভৌতিক লোককথা। প্রতিটি প্রাচীন শহর, গির্জা, দুর্গ কিংবা পরিত্যক্ত স্টেশনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে রহস্যময় সব অশরীরী উপস্থিতির গল্প। যেমনটা শোনা যায় কেমব্রিজ শহরে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত এই শহরের ঐতিহাসিক কলেজ ভবন, নিস্তব্ধ বাগান আর পাথরের দেয়ালঘেরা পথে দিনের আলোয় আভিজাত্যের ছাপ থাকলেও, হ্যালোউইনের কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে সেগুলো যেন নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে। কোথাও পরিত্যক্ত কোনো রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে মধ্যরাতে শোনা যায় অদৃশ্য কারও পায়ের শব্দ, কোথাও আবার শতাব্দীপ্রাচীন কোনো গির্জার ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে মিশে থাকে অশরীরী উপস্থিতির গল্প। রোমানদের পদচিহ্ন থেকে অ্যাংলো-স্যাক্সনদের বসতি কেমব্রিজের ইতিহাস যেন সময়ের দীর্ঘ এক যাত্রা। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসে যাঁদের অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত।

কেমব্রিজের বিখ্যাত ক্রাইস্টস কলেজের ফেলোজ গার্ডেনে একটি প্রাচীন মালবেরিগাছ রয়েছে, যা ঘিরে গড়ে উঠেছে ক্রিস্টোফার রাউন্ডের এক রহস্যময় আখ্যান। তেনাদের ঘাঁটতে গিয়ে খোঁজ মিলল কেমব্রিজের বিখ্যাত প্রেমিক ভূত খ্রিস্টোফার রাউন্ডের। বলা বাহুল্য, ক্রাইস্টস কলেজের ইতিহাসও কম সমৃদ্ধ নয়।

কিংবদন্তি অনুযায়ী, পূর্ণিমা রাতে এই গাছের চারপাশে এক দীর্ঘদেহী প্রৌঢ়কে হাঁটতে দেখা যায়। মাথায় পুরোনো দিনের বিভার-ফেল্টের টুপি, সামান্য কুঁজো হয়ে ধীরস্থিরভাবে চলা এই ছায়ামূর্তিই হলো ক্রিস্টোফার রাউন্ডের অতৃপ্ত আত্মা। এই কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জগদীশ চন্দ্র বসু, চার্লস ডারউইন, জন মিল্টন ও লর্ড মাউন্টব্যাটেনের মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিরা। তাঁদের পদচারণায় মুখর প্রাঙ্গণেই নাকি শত বছর আগে ঘটেছিল প্রেম ও ঈর্ষার এক ট্র্যাজেডি। যেসব ভূতকে নাকি পেলেপুষে রাখে ব্রিটিশ হেরিটেজ। নিঃশব্দে, ধীর পায়ে সে ঘুরে বেড়ায় গাছটির চারপাশে। এই কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন চার্লস ডারউইন, জন মিল্টন, জে রবার্ট ওপেনহাইমার, সাচা ব্যারন কোহেন, রোয়ান উইলিয়ামস, জগদীশ চন্দ্র বসু, লর্ড মাউন্টব্যাটেন, জান স্মাটস, মার্টিন ইভান্স, ডানকান হ্যালডেন, জন অলিভারের মতো বহু বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। সেই প্রাঙ্গণে নাকি ঘাপটি মেরে ঘুরে বেড়াচ্ছে শত বছর আগের মৃত ক্রিস্টোফার রাউন্ডের তেনারা।

উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ক্রাইস্টস কলেজের ক্ল্যাসিক্যাল স্টাডিজের ফেলো ছিলেন ক্রিস্টোফার রাউন্ড। তিনি লেডি মেরি ক্লিফোর্ড নামের এক নারীর প্রেমে পড়েন। তবে সেই সম্পর্কের পথে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ান কলেজেরই আরেক পণ্ডিত ফিলিপ কলিয়ার। এক সন্ধ্যায় অতিরিক্ত মদ্যপানের পর কলিয়ার কলেজের একটি খোলা সুইমিংপুলে পড়ে যান। জীবন বাঁচানোর জন্য তিনি আর্তনাদ করলেও, কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা ক্রিস্টোফার রাউন্ড তাকে উদ্ধারের পরিবর্তে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। সেই থেকেই নাকি অপরাধবোধ আর অনুশোচনায় রাউন্ডের আত্মা মুক্তি পায়নি। ঠান্ডা পানিতে হাবুডুবু খেতে খেতে সে প্রাণ বাঁচানোর জন্য চিৎকার করতে থাকে। কলিয়ারকে বাঁচানোর সুযোগ ক্রিস্টোফারের ছিল। কথিত আছে, কলিয়ারের মৃত্যুর পর থেকেই রাউন্ডের মধ্যে জন্ম নেয় গভীর অনুশোচনা।

শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করলে কেমব্রিজের এই গল্পের সঙ্গে বাংলার লোককথার এক অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়। আমার নিজের গ্রামেও একসময় এমন একটি কাহিনি প্রচলিত ছিল। আমাদের এলাকার এক আরবি শিক্ষক ও স্বামীহারা এক বিধবা নারীর সম্পর্ককে তৎকালীন সমাজ মেনে নিতে পারেনি। প্রবল সামাজিক লাঞ্ছনার শিকার হয়ে সেই নারী মসজিদের কাছের এক করচগাছে নিজের জীবন বিসর্জন দেন। সেই থেকে তীব্র শীতের ভোরে আজানের সময় সাদা থান পরা এক নারীকে মসজিদের আশপাশে দেখা যেত বলে জনশ্রুতি রয়েছে। ভূত, প্রেত, বল্লা, জিন, দেওয়ের গল্প শুনে কেটেছে আমাদের শৈশব। একই নারীকে ঘিরে দুই পুরুষের এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধীরে ধীরে এক অন্ধকার পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়; বরং শুরু হয় আরও অন্ধকার এক অধ্যায়ের।

কেমব্রিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাগানের ক্রিস্টোফার রাউন্ড কিংবা বাংলার গ্রামের সেই বিধবা নারীর গল্প—উভয় ক্ষেত্রেই রয়েছে অসমাপ্ত প্রেম, সামাজিক নিষ্ঠুরতা, অপরাধবোধ ও অপূরণীয় মৃত্যুর হাহাকার। ভূতের অস্তিত্ব বা ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকলেও, মানুষের স্মৃতি ও লোককথায় তারা আজও বেঁচে আছে। শীতের কুয়াশায় বা পূর্ণিমার রাতে যখন এসব পুরোনো গল্পের কথা মনে পড়ে, তখন প্রশ্ন জাগে—মৃত্যুই কি সব গল্পের শেষ? নাকি মানুষের অব্যক্ত বেদনা ও অপরাধবোধ কোনো এক অদৃশ্য রূপে রয়ে যায় চিরকাল? তাই এহেন ঘোর হ্যালোউইন, অর্থাৎ তেনাদের রাত্রে বেরোলাম ভূতের খোঁজে।

লেখক পরিচিতি: ড. অসীম চক্রবর্তী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বায়োমেডিক্যাল ইনফরমেটিকস বিষয়ের শিক্ষক ও গবেষক, এংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ, যুক্তরাজ্য।