রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণের জন্য তৈরি, মানুষ প্রযুক্তির জন্য নয়। প্রযুক্তির অগ্রগতি যেন দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বেকারত্ব বাড়িয়ে না দেয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখার তাগিদ দেন তিনি। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তাই এ সম্মেলন নিছক কোনো অনুষ্ঠান নয়, বরং ভবিষ্যতের পথরেখা তৈরির মঞ্চ। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু একটি ভবিষ্যৎমুখী প্রযুক্তি নয়, বাংলাদেশের জন্য এটি ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। তারাই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রধান সৈনিক। বাংলাদেশে বেকারত্ব অন্যতম প্রধান সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এআই যেন এ সমস্যাকে আরও প্রকট না করে, সেটাও মনে রাখা জরুরি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বিশ্ব আজ এক বড় পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে এবং এ পরিবর্তনের মূল অনুঘটক হলো এআই।
এই প্রযুক্তি বাংলাদেশের কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। আগামী দশকে এআইয়ের পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিকে কোথায় নিয়ে যাবে এবং বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় হবে, তা নির্ধারণ করে দেবে। আজকের বিশ্বে সেই নতুন জ্ঞানের নামই এআই। বিদ্যুৎ যেমন পুরো সভ্যতাকে বদলে দিয়েছিল, এআইও তেমনই সবকিছু বদলে দিচ্ছে এবং সামনে আরও দ্রুত পরিবর্তন আনবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প যেমন বিশ্বে দেশকে পরিচিত করেছে, তেমনই আগামী দিনে এআইশিল্পও বাংলাদেশকে বিশ্বে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করতে সক্ষম হবে বলে আমরা আশাবাদী। বাংলাদেশকে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
তবে কেবল ব্যয় কমানোর মাধ্যম হিসেবে এআইকে না দেখে একে নতুন পণ্য উদ্ভাবন, বাজারের পরিধি বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির কৌশল হিসেবে গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি। এআইকে উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্পের আধুনিকায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কোটি তরুণের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান তৈরির কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। এজন্য এর নিরাপদ ব্যবহার ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আবশ্যক।
তিনি এআইকে বিদ্যুৎ আবিষ্কারের মতো একটি যুগান্তকারী প্রযুক্তি হিসেবে অভিহিত করেন, যা ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্য যুক্ত করবে।
একটি জাতির উন্নয়ন নির্ভর করে তারা নতুন প্রযুক্তিকে কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে গ্রহণ করছে তার ওপর। তবে রাষ্ট্রপতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, এআই যেন সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে না ওঠে। প্রযুক্তি যেন মানুষের সক্ষমতা ও মানবিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় মানবসভ্যতা অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে। তাই প্রযুক্তির দায়িত্বশীল উদ্ভাবন ও ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন তিনি। তবে এআই ব্যবহারে আশঙ্কা ও বিপদের কথাও তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, এআই যেন সবকিছুর নিয়ন্ত্রণের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয়, সেদিকে পদে পদে খেয়াল রাখতে হবে।
বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনে সরকারি-বেসরকারি খাত, বিশ্ববিদ্যালয় ও তরুণ প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তরুণ সমাজ, যারা প্রযুক্তিবান্ধব ও উদ্ভাবনী। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করলে এআই খাতেও বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ নতুন পরিচয় গড়ে তুলতে পারবে। রাষ্ট্রপতি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি খাত, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় এবং তরুণ প্রজন্ম একসঙ্গে কাজ করলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ২০৪১ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির যে স্বপ্ন বাংলাদেশ দেখছে, তা। তবে এ বিপ্লবের সুফল পেতে তরুণদের প্রযুক্তিতে দক্ষ ও সুপ্রশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, পোশাকশিল্পের মতো এআইশিল্পেও বাংলাদেশ যেন নেতৃত্ব দিতে পারে, এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয় এআই সক্ষমতা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। এআইয়ের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে এমন এক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য থাকতে হবে, যা প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। পরিশেষে, তিনি সম্মেলনের সাফল্য কামনা করে অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।







