চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে ঘটে যাওয়া এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। পলাতক সন্ত্রাসী এবং র্যাবের কর্মকর্তা হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি মো. ইয়াসিনের মালিকানাধীন প্রায় শতকোটি টাকা মূল্যের ৬৫টি জমির দলিল মাত্র একদিনের ব্যবধানে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার পর আইন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ সুপারের কার্যালয় নড়েচড়ে বসেছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য মাঠে নেমেছে। বাজারমূল্যের হিসাবে রেজিস্ট্রিকৃত এই স্থাবর সম্পত্তির দাম প্রায় শতকোটি টাকা। কাগজপত্র ও দলিলসহ এসব জমি বিক্রির জন্য দলিল জমা দেন।
অভিযোগ রয়েছে, সাবরেজিস্ট্রার রায়হান হাবীব প্রায় দুই কোটি টাকা ঘুস গ্রহণ করে এই দলিলগুলোর রেজিস্ট্রি পাকাপোক্ত করেছিলেন। এ ঘটনার সত্যতা পাওয়া মাত্রই তার বদলির আদেশ সাত দিনের জন্য স্থগিত করে আইন মন্ত্রণালয়। বর্তমানে রেজিস্ট্রি হওয়া দলিলগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মূল লক্ষ্য হলো, এত বিপুল সংখ্যক দলিল কেন একদিনে সম্পন্ন করা হলো, জমির পরিমাণ কত, কার নামে হস্তান্তর করা হয়েছে, সরকারের কোনো স্বার্থ সেখানে বিঘ্নিত হয়েছে কিনা এবং বর্তমান বাজার মূল্য কত তা যাচাই করা।
এছাড়া, আইন অনুযায়ী দলিলে দাতা হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। পুলিশের খাতায় পলাতক আসামি ইয়াসিন সেই সময় সীতাকুণ্ড সাবরেজিস্ট্রি অফিসে উপস্থিত ছিলেন কিনা, সেটিও তদন্তের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সীতাকুণ্ড সাবরেজিস্ট্রি অফিসের সহকারী সিরাজউদ্দিন দাবি করেছেন, দলিলগুলো ব্যক্তি মালিকানার জমির এবং ইয়াসিনের নামে নামজারি থাকায় নিয়ম মেনেই তা করা হয়েছে। তার ভাষ্যমতে, জমিগুলো নিয়ে সরকারের কোনো বিশেষ বিধিনিষেধ ছিল না।
ঘটনার সূত্রপাত হয় সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে, যেখানে ইয়াসিন বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে সরকারি খাস জায়গা কৌশলে নিজেদের নামে বিএস রেকর্ড করে দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। গত সোমবার সাবরেজিস্ট্রার রায়হান হাবীবকে টাঙ্গাইলের ভূয়াপুরে বদলির আদেশ দেওয়া হয় এবং বৃহস্পতিবার তার যোগদানের সময় নির্ধারিত ছিল। ঠিক যোগদানের আগের দিনই মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে তিনি বিতর্কিত এই রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়টি জানতে পেরে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বুধবার বিকালে আইন মন্ত্রণালয়ে মৌখিক অভিযোগ করেন। তিন মাস ধরে এসব জায়গা নানা জনের কাছে বিক্রি করার চেষ্টা করছিলেন। বৃহস্পতিবারের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের কথা ছিল তার।
সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত জঙ্গল সলিমপুরে ইয়াসিন ও রুকন মেম্বারের বাহিনী সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে। গত ১৯ জানুয়ারি র্যাবের একটি দল আসামি ধরতে গেলে ইয়াসিন বাহিনী ও স্থানীয়রা মিলে নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে পিটিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনার পর থেকেই পুলিশের খাতায় ইয়াসিন পলাতক এবং তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। গত ১৯ জানুয়ারি এক আসামিকে গ্রেফতারে অভিযান চালাতে কয়েকটি মাইক্রোবাসে করে জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করে তৎকালীন র্যাবের একটি দল। এ সময় র্যাব-৭ এর উপসহকারী পরিচালক নায়েক সুবেদার মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে পিটিয়ে হত্যা করে তারা।
পরবর্তীতে গত ২৪ মে ইয়াসিনের নেতৃত্বে দুই থেকে তিনশ সন্ত্রাসী নির্মাণাধীন র্যাব ও যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালায়। ওই সময় সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধে প্রশাসন ১০৪ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। এই হামলার ঘটনায় তিন শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হলেও প্রধান আসামি ইয়াসিন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। পুরো বিষয়টি এখন আইন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক তদন্ত প্রক্রিয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ ঘটনায় ইয়াসিনকে প্রধান আসামি করে ৩ শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ। পাশাপাশি ইউএনও কার্যালয়ও দেখভাল করছে। তাদের হয়ে আরও একাধিক উপ-বাহিনীর বিচরণ রয়েছে এই এলাকায়।








