আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে উত্তর কোরিয়া আয়ের বিকল্প পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে সাইবার অপরাধ। বিশ্বের বিভিন্ন ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ও ডিজিটাল আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের সাইবার হামলা চালিয়ে দেশটি বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। সম্প্রতি চীনভিত্তিক বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স থেকে ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি সম্পদ চুরির ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। রয়টার্স ও যুক্তরাষ্ট্রের চেইনঅ্যানালাইসিসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব অর্থ উত্তর কোরিয়ার বিতর্কিত পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন উৎস হয়ে উঠেছে সাইবার অপরাধ।
ক্রিপ্টো চুরির ভয়াবহ চিত্র
ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা অন্তত ২০০ কোটি ২০ লাখ ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করেছে। আগের বছরের তুলনায় এই অঙ্ক ৫১ শতাংশ বেশি। সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হ্যাকারদের চুরি করা ক্রিপ্টো সম্পদের পরিমাণ অন্তত ৬৭৫ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, হামলার সংখ্যা কমলেও চুরি করা অর্থের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার মানে হলো হ্যাকাররা এখন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বড় ধরনের ডিজিটাল ডাকাতিতে লিপ্ত হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্যেও আছে নানা বাধা। অর্থাৎ সিঁদেল চুরি নয়, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা এখন রীতিমতো পুকুর চুরিতে নেমেছে। চুরি করা অর্থের পুরোটাই সরাসরি সামরিক খাতে ব্যয় হয়—এমন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই।
অর্থ পাচার ও মধ্যস্থতাকারী নেটওয়ার্ক
- যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বহুপথীয় নিষেধাজ্ঞা পর্যবেক্ষণ দল (এমএসএমটি) জানিয়েছে, চুরি করা সম্পদ পাচারে চীনসহ বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতাকারীদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে উত্তর কোরিয়া।
- চুরি করা ডিজিটাল সম্পদ প্রচলিত মুদ্রায় রূপান্তরে চীন, রাশিয়া, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যস্থতাকারীরা সহায়তা করছে।
- চীনের ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) ব্যবসায়ীদের ওপর দেশটি সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল।
- উত্তর কোরিয়ার আইটি খাতের আয় ও ক্রিপ্টো চুরির অর্থ পাচারে অন্তত ১৫টি চীনা ব্যাংককে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।
লাজারাস গ্রুপের তৎপরতা ও কর্মপদ্ধতি
আন্তর্জাতিক তদন্তে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সাইবার ইউনিট, বিশেষ করে ‘লাজারাস গ্রুপ’-এর সংশ্লিষ্টতা উঠে এসেছে।
এই গোষ্ঠীটি ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ও ব্যক্তিগত ওয়ালেট লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিট থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের ইথেরিয়াম চুরির জন্যও তাদের দায়ী করা হয়।
হ্যাকাররা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ভুয়া চাকরির প্রস্তাব, ক্ষতিকর সফটওয়্যার ও পরিচয় জালিয়াতির মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলে।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) তথ্য অনুযায়ী, চুরি করা ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রথমে একাধিক ওয়ালেটে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক ও ক্রিপ্টো মিক্সার ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থের উৎস গোপন করা হয় এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে তৃতীয় দেশের মাধ্যমে তা বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তর করা হয়।
তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর ছদ্মবেশে প্রতারণা
সাইবার হামলার পাশাপাশি বিদেশে তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী পাঠিয়েও অর্থ আয় করছে উত্তর কোরিয়া। এমএসএমটির ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে প্রায় দুই হাজার উত্তর কোরীয় আইটি কর্মীর তথ্য উঠে এসেছে। চেইনঅ্যানালাইসিসের মতে, ২০২৪ সালে এসব কর্মীর প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড থেকে দেশটি প্রায় ৮০ কোটি ডলার আয় করেছে। এই কর্মীদের আয় ও অর্থ স্থানান্তরে সহায়তার অভিযোগে ২০২৬ সালের ১২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ছয় ব্যক্তি ও দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। উত্তর কোরিয়ার এই বহুমুখী সাইবার অপরাধের পেছনে দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো সরাসরি জড়িত বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জোরালো ধারণা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশ এই গোষ্ঠীকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে চিহ্নিত করেছে।








