টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার দেউলী ইউনিয়নের বাবুপুর গ্রামের বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে খেলার মাঠ তৈরি করে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। প্রায় সাড়ে তিন হাজার জনসংখ্যার এই গ্রামে সাত শতাধিক পরিবারের বসবাস থাকলেও দীর্ঘকাল ধরে কোনো খেলার মাঠ ছিল না। ফসল তোলার পর ফাঁকা জমিতে শিশুরা খেলার সুযোগ পেলেও বছরের বাকি সময় তাদের খেলাধুলা বন্ধ থাকত। এই সংকট দূর করতে গ্রামের ধনী-গরিব সবাই একত্রিত হয়ে চাঁদা তুলে খেলার মাঠের জন্য ৬০ শতাংশ জমি কেনেন। গত বৃহস্পতিবার বাদ্য বাজিয়ে সেই জমি বুঝে নেওয়ার মধ্য দিয়ে গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। বাবুপুর গ্রামে ৭ শতাধিক পরিবারের বসবাস। এখানে সাড়ে ৩ হাজারের বেশি জনসংখ্যা। এই গ্রামে গতকাল ছেলে–বুড়ো সবাই সারা দিন আনন্দে মেতেছিলেন। একদিন এই মাঠকে কেন্দ্র করেই গ্রামের ক্রীড়াচর্চা হবে।’।
মাঠের জমি কেনার এই উদ্যোগের নেপথ্যে ছিলেন গ্রামের সন্তান এস এম ইকবাল মাহমুদ ও ক্রীড়াব্যক্তিত্ব খোরশেদ আলম। তাঁরা গত কয়েক মাস ধরে গ্রামের বিত্তবান ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলোচনা করেন। গত ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে মতবিনিময় সভা করে গ্রামবাসীকে জমি কেনার বিষয়টি জানানো হয়। খোরশেদ আলম জানান, ইকবাল মাহমুদ ও তিনি ছাড়াও আজাহার শিকদার, সেলিম আল মামুন, মিজানুর রহমান, মজনু শিকদার, শফিকুল ইসলাম ও শুভ প্রামাণিক বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া গ্রামের সাধারণ মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান দিয়ে এই মহৎ কাজে শরিক হয়েছেন। গ্রামবাসী কেউ ২০০ টাকা, কেউ ৫০০ টাকা, কেউ ১ হাজার টাকা, কেউ কেউ তাঁদের সামর্থ্য অনুযায়ী ২ হাজার, ৫ হাজার ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেন।’। এ প্রস্তাবে উৎসাহ দেখান খোরশেদ আলম। পরে আমরা গ্রামের কয়েকজন বিত্তবান মানুষের সঙ্গে কথা বলি। গ্রামের সবার কাছেই জমি কেনার জন্য অর্থসহায়তা চাওয়া হয়।
জমি বিক্রয়কারী ইকবাল হোসেন সুজনের কাছ থেকে প্রতি শতাংশ ৫২ হাজার টাকা মূল্যে ৬০ শতাংশ জমি কেনা হয়েছে। উল্লেখ্য, বিক্রেতা নিজেই এক শতাংশ জমি মাঠের জন্য দান করেছেন। বৃহস্পতিবার জমি হস্তান্তরের পর সেখানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং গ্রামবাসীরা আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠেন। এলাকার কিশোর হাবিবুল্লাহ সালমান ও রাব্বী জোহা জানায়, মাঠে খেলার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বাড়ির উঠানে ফুটবল খেলতে গিয়ে ঘরবাড়ি বা বেড়ার ক্ষতির ভয় আর থাকবে না। এখন থেকে সারা বছর খেলাধুলা করতে পারবে বলে তারা উচ্ছ্বসিত। অপর কিশোর রাব্বী জোহা বলে, ‘বাড়ির উঠানে খেলতে গেলে ফুটবলের আঘাতে ঘরের বেড়া ক্ষতি হতো।
প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল মান্নান ব্যাপারী বলেন, দীর্ঘদিনের চেষ্টার পর এমন একটি মাঠ বাস্তবায়ন হওয়ায় তারা অত্যন্ত আনন্দিত। বাবুপুর মসজিদ কমিটির সভাপতি নজরুল শিকদার আশা প্রকাশ করেন যে, এই মাঠে নিয়মিত খেলাধুলা চর্চা করলে কিশোর ও যুবকেরা সুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে এবং মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকবে। মোনালিসা উইমেন্স স্পোর্টস একাডেমির পরিচালক ও স্থানীয় বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক মোনালিসা মুন্নি এই অর্জনকে গ্রামের মানুষের জন্য একটি বড় প্রাপ্তি বলে অভিহিত করেন। গ্রামের যুবকেরা ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নিয়েছেন অর্থদাতা ও প্রবীণ ব্যক্তিদের। আজ আমাদের স্বপ্নের মাঠ বাস্তবায়ন হলো।
খেলার মাঠের জন্য কেনা এই ৬০ শতাংশ জমির পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও ৬০ শতাংশ জমি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে উদ্যোক্তাদের। সর্বমোট ১২০ শতাংশ জমি হলে মাঠটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে বলে জানান খোরশেদ আলম। সরকারি-বেসরকারি কোনো সহায়তা ছাড়াই গ্রামবাসীর নিজস্ব অর্থায়নে গড়ে তোলা এই মাঠের প্রশংসা করেছেন সরকারি মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শামসুল হুদা। তাঁর মতে, বাবুপুর গ্রামের বাসিন্দাদের এই দৃষ্টান্ত দেশের অন্যান্য গ্রামের মানুষকেও অনুপ্রাণিত করবে।








