চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার দশপাড়ার বাসিন্দা ৭১ বছর বয়সী তৈয়ব আলী জীবনের ৫৫টি বছর কাটিয়েছেন নারকেলগাছ পরিষ্কার বা ‘গাছ বাছাই’ করার পেশায়। কিশোর বয়সে শখের বশে গাছে ওঠাকেই পরবর্তীতে তিনি জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। দীর্ঘ এই কর্মজীবনে এ পর্যন্ত প্রায় ২৭ হাজার নারকেলগাছ পরিষ্কার করেছেন তিনি। বর্তমানে নিজের পৈতৃক বাড়িতে স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার চলছে এই কাজের উপার্জনেই। ৫৫ বছর ধরে মানুষের নারকেলগাছের মরা ডালপালা কেটে পরিষ্কার করছেন গাছি তৈয়ব আলী (৭১)। মজুরির বিনিময়ে উপজেলার প্রায় সব গ্রামে ছোট-বড় নারকেলগাছ বাছাই করেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে নয়টায় উপজেলার কলাদী এলাকায় একজনের নারকেলগাছ বাছাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তৈয়ব আলী।
তৈয়ব আলীর জীবনের গল্পটি সংগ্রামের। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর মাকেও হারান তিনি। জমিজমাহীন সংসারে টিকে থাকতে কৈশোর থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত কর্মচঞ্চল। স্থানীয়রা তাঁকে ‘গেছো ছেলে’ হিসেবে ডাকতেন, কারণ তিনি অনায়াসেই উঁচু গাছে চড়ে ফল পেড়ে দিতেন। সেই দক্ষতা থেকেই ১৯৭১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে গাছ বাছাইয়ের পেশা শুরু করেন। শুরুতে প্রতিটি গাছের জন্য মজুরি ছিল ১০ টাকা, যা সময়ের ব্যবধানে বেড়ে বর্তমানে ২০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। মাসে গড়ে ৪০টি গাছ পরিষ্কার করে তাঁর আয় হয় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। প্রথম দিকে প্রতিটি গাছের জন্য মালিকের কাছ থেকে নিতেন ১০ টাকা। সেখানেই সঙ্গে কথা হয় তাঁর। পরে তা বেড়ে হয় ৩৫ টাকা। গাছে উঠে মানুষকে নারকেলসহ নানা ফল পেড়েও দিতেন।
তাঁর কাজের পরিধি শুধুমাত্র মতলব দক্ষিণেই সীমাবদ্ধ নেই; মতলব উত্তর উপজেলার লক্ষ্মীপুর, লুধুয়া, ফতেপুর, ঠেটালিয়া, রসুলপুর, বালুচর, সুজাতপুর, দুর্গাপুর ও গজারাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ডাক আসে তাঁর। স্থানীয়দের মতে, তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে কাজ করেন। এমনকি আর্থিক অসচ্ছল মানুষের গাছ হলে তিনি অনেক সময় কোনো পারিশ্রমিকও নেন না। তবে এই দীর্ঘ কর্মজীবনে ঝুঁকিমুক্ত ছিলেন না তিনি। ২৫ বছর আগে গাছ থেকে পড়ে গিয়ে তিনি ডান পা ও কোমরে গুরুতর আঘাত পান, তবুও থেমে যাননি। পাশের মতলব উত্তর উপজেলাতেও যান এ কাজে। বছরে এ সংখ্যা ৪৮০ থেকে ৫০০। কেউ অনুরোধ করলে দেরি করেন না তিনি, দা ও রশি নিয়ে ছোটে যান। ২৫ বছর আগে মতলব দক্ষিণের এক ব্যক্তির নারকেলগাছ বাছাই করতে গিয়ে পা পিছলে মাটিতে পড়ে যান তিনি।
তৈয়ব আলীর এই অদম্য মানসিকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে কলাদী এলাকার বাসিন্দা মো. আহনাব বলেন, বৃদ্ধ বয়সেও যেভাবে তিনি ঝুঁকি নিয়ে নারকেলগাছে কাজ করে যাচ্ছেন, তা বিরল। মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম ইশমাম জানান, তৈয়ব আলী শ্রমজীবী মানুষের এক উজ্জ্বল প্রতিনিধি। নিজের কাজকে তিনি যেভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন তা প্রশংসনীয়। চিকিৎসা নিয়েও পুরোপুরি সুস্থ হননি।
শরীর এখন আর আগের মতো সায় দেয় না বলে জানান তৈয়ব আলী। বয়সের ভার ও পুরোনো আঘাতের যন্ত্রণাকে সঙ্গী করেই তিনি বলেন, যতদিন শরীরে শক্তি আছে, ততদিন এই কাজ চালিয়ে যেতে চান। সংসার চালানোর তাগিদে এই পরিশ্রমই তাঁর জীবনের একমাত্র অবলম্বন। প্রয়াত ওহাব আলী ও আমেনা বেগম দম্পতির একমাত্র সন্তান তিনি। কৈশোরেই সংসারের ভার এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। তবু যতক্ষণ শরীরে কুলায়, এই কাম কইরা যামু।








