দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে এক অভূতপূর্ব নিম্নমুখী ধারা দেখা গেছে। গত ২২ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এবারের গড় পাসের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে উচ্চতর মেধার মানদণ্ড জিপিএ-৫ অর্জনের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পতন ঘটেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ অর্জনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২৭ হাজারের বেশি কমে গেছে। এছাড়া শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যেমন হ্রাস পেয়েছে, তেমনি একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি এমন প্রতিষ্ঠানের তালিকা দীর্ঘ হয়েছে। তাঁর মত, বছরের পর বছর ধরে অনেক স্কুল-কলেজে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যার এক ভাগও শিক্ষা কার্যক্রমে কাজে লাগে না। প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও কার স্বার্থে এত ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, এইচএসসির এ ফলাফলের পেছনে একাধিক কারণ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। ঢাকা বোর্ড ব্যতীত অন্য সব বোর্ডে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের চরম দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে, যা সামগ্রিক পাসের হারকে টেনে নিচে নামিয়েছে। পাশাপাশি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েও শিক্ষার্থীদের ফল সন্তোষজনক ছিল না। খাতা মূল্যায়নে কঠোরতা অবলম্বন, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে নানা অসংগতি, বৈরী আবহাওয়া এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের অভাব ও প্রস্তুতির ঘাটতিকেও এই অবনতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পাঠদান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের প্রাপ্যতা, শ্রেণিকক্ষে ইংরেজি শেখানোর পরিবেশ এবং পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন—সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকের মান না বাড়ালে দুরবস্থা কাটবে না।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫১.৬২ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে ছিল ৫৭.১২ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে প্রায় ৫.৫ percentage point। এর আগে ২০২৪ সালে এই পাসের হার ছিল ৭৫.৫৬ শতাংশ। শুধু পাসের হার নয়, ফলাফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এবার নয়টি বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩৫,৯৪৮ জন পরীক্ষার্থী, যেখানে আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৬৩,২১৯ জন। ফলে এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ কমার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭,২৭১-এ। অর্থাৎ, এক বছরে পাসের হার কমেছে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট।
গতকাল শনিবার নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। একই দিনে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি (বিএম/বিএমটি), এইচএসসি ভোকেশনাল ও এইচএসসি ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষার ফলও প্রকাশ্যে আসে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় মোট ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। পরীক্ষা দেওয়া মোট শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেকই অকৃতকার্য হয়েছেন। এ ছাড়া বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ায় পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।
লিঙ্গভিত্তিক ফলাফলের তথ্যে দেখা যায়, পাসের হারের দিক দিয়ে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছেন। ছাত্রীদের পাসের হার ৫৫.৪৫ শতাংশ হলেও ছাত্রদের ক্ষেত্রে তা ৪৭.১৪ শতাংশ। তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার বিচারে ছাত্ররা সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। মোট জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের মধ্যে ছাত্রের সংখ্যা ১৮,১৫৫ জন এবং ছাত্রী ১৭,৭৯৩ জন।
নয়টি শিক্ষা বোর্ডের পৃথক ফলাফলে দেখা যায়, পাসের হারের দিক থেকে সবচেয়ে ভালো ফল করেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, যেখানে পাসের হার ৬১.৮০ শতাংশ। অপরদিকে সবচেয়ে খারাপ ফল হয়েছে বরিশাল বোর্ডে, যেখানে ৪৪.৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন। অন্য বোর্ডগুলোর মধ্যে রাজশাহীতে ৪৫.০৬ শতাংশ, কুমিল্লায় ৪৮.০৪ শতাংশ, যশোরে ৪৪.৯২ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৫২.০৭ শতাংশ, সিলেটে ৫০.৯০ শতাংশ, দিনাজপুরে ৪৫.৯৮ শতাংশ এবং ময়মনসিংহে ৫১.৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন। এবার দেশের সব শিক্ষা বোর্ডে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে একটি নির্দিষ্ট নির্দেশিকা অনুসরণ করা হয়।
২০০৫ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২২ বছরের পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দুই বছর ধরেই ফলাফলের পতন স্পষ্ট। ২০২৪ সালে যেখানে পাসের হার ছিল ৭৫ শতাংশের ওপরে, গত বছর তা নেমে আসে ৫৭ শতাংশে এবং এ বছর তা আরও কমে ৫১.৬২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর আগে ২০০৫ সালে পাসের হার ছিল ৫৯ শতাংশের বেশি। তবে ২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোনো বছরই এই হার ৬০ শতাংশের নিচে নামেনি। বেশিরভাগ বছরেই পাসের হার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছিল। এর মধ্যে ২০২০ সালে মহামারি করোনার কারণে পরীক্ষা ছাড়াই শতভাগ পরীক্ষার্থীকে পাস করানো হয়েছিল।
এবারের ফলাফলে বিশেষ করে ইংরেজি বিষয়ে পরীক্ষার্থীদের দুর্বল পারফরম্যান্স চোখে পড়ার মতো। ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭৩.৬২ শতাংশ হলেও অন্য আটটি বোর্ডে এই হার ৫০ থেকে ৬৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বিশেষ করে বরিশাল বোর্ডে পাসের হার সর্বনিম্নে নামার পেছনে ইংরেজিতে মাত্র ৫৪ শতাংশের মতো পাসের ঘটনাই প্রধানত দায়ী। একইসঙ্গে আবশ্যিক বিষয় আইসিটিতেও কোনো বোর্ডেই পাসের হার ৮০ শতাংশ স্পর্শ করতে পারেনি। বিষয়ভিত্তিক এই দুর্বলতার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে চূড়ান্ত ফলাফলে। কিন্তু কোনো সরকারই এ বিষয়ে যথেষ্ট নজর দিচ্ছে না।
পরীক্ষাসংক্রান্ত ব্যবস্থাপনায় নানা ভুলত্রুটিও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যেমন, পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নে ভুল থাকার কথা সরকার স্বীকার করে এবং সেটির জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়া হয়। রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের প্রশ্নেও বিভিন্ন অসংগতির কথা জানান শিক্ষার্থীরা। কোথাও কোথাও নিয়মিত শিক্ষার্থীদের হাতে অনিয়মিতদের প্রশ্নপত্র তুলে দেওয়া কিংবা প্রথম পত্রের জায়গায় দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। এসব অব্যবস্থাপনার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নোটিশ প্রদান ও দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এছাড়া প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া এবং নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রয়োগকেও অনেকে কারণ হিসেবে গণ্য করছেন। তবে এসব কারণের কোনটির প্রভাব কতটা, তা নির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত ছাড়া বলা সম্ভব নয়।
শিক্ষা পরিবেশের এই ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি স্বীকার করেন, ফলাফলে দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়ায় বড় রকমের ঘাটতি রয়ে গেছে। তিনি জানান, ফলাফলে অন্য কোনো ত্রুটি রয়েছে কিনা তা পুনর্মূল্যায়নের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। এবার এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। চার লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থী এক বা দুই বিষয়ে ফেল করেছেন। এর মধ্যে এক বিষয়ে ফেল করেছেন ২ লাখ ৯৮ হাজার ৪০ জন এবং দুই বিষয়ে ফেল করেছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ৮৬৫ জন। তারা আগামী এক মাসের মধ্যে শুধুমাত্র অকৃতকার্য বিষয়ের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এ কথা বলেন। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, এবার এক ও দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া পরীক্ষার্থী ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন।
রেওয়াজ অনুযায়ী কোনো শিক্ষার্থী ফেল করলে তাঁকে পুরো এক বছর অপেক্ষা করে পুনরায় পরীক্ষায় বসতে হতো। তবে শিক্ষার্থীদের এই দীর্ঘ সময় যেন নষ্ট না হয়, সে জন্য এই বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্যদের পুনরায় পরীক্ষার তারিখ, ফরম পূরণের সময়সূচি ও নির্দিষ্ট ফির বিবরণ আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যে জানিয়ে দেওয়া হবে। ঢাকা বোর্ডের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, আগামী ২ ডিসেম্বর এই বিশেষ পরীক্ষা নেওয়া হতে পারে এবং ডিসেম্বরের মধ্যেই ফল প্রকাশের চিন্তাভাবনা রয়েছে যাতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সুযোগ হারানো থেকে রক্ষা পান।
ফলাফলের এই বড় ধরনের অবনতি নিয়ে যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আমিরুল আলম খান মত প্রকাশ করেন যে, শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা, মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি না করলে শিক্ষার সামগ্রিক কাঠামোর উন্নয়ন অসম্ভব। দেশের ৯০ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে বিশাল অবকাঠামো ও ভবন তৈরি করা হয়েছে, তার অর্ধেক অর্থও যদি শিক্ষকমণ্ডলীর প্রশিক্ষণ ও মানোন্নয়নে খরচ করা হতো, তবে শিক্ষার গুণগত মান বহুলাংশে বৃদ্ধি পেত। সব সরকারের সময়েই শিক্ষক কাঠামোর মানোন্নয়ন উপেক্ষিত থেকেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি কর্মরত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আরও দক্ষ করে তুলতে হবে। শিক্ষকদের মান না বাড়িয়ে শিক্ষার মান বাড়ানোর পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত নয়।








