ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের রক্ষণভাগে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ কেন ‘গোলমাল পাকানো লোক’?

Published: November 2, 2026, 11:25 am

ফুটবল মাঠে রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের শীতল মাথার পরিচয় দেওয়াটা অতি জরুরি। ছোট একটি ভুল যেমন পুরো দলের পরাজয়ের কারণ হতে পারে, তেমনি একটি লাল কার্ড পুরো ম্যাচ থেকেই ছিটকে দিতে পারে দলকে। সম্প্রতি চেলসির বিপক্ষে ম্যাচে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের আচরণ ও লাল কার্ড দেখার ঘটনাটি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বর্তমান ভঙ্গুর অবস্থারই একটি প্রতিচ্ছবি। ফুটবলে একটা কথা আছে, রক্ষণভাগের খেলোয়াড়ের মাথা সবচেয়ে বেশি ঠান্ডা থাকতে হয়। লিসান্দ্রো মার্তিনেজের মাথা যে সেদিন কতটা গরম ছিল, তা বুঝতে তাঁর মাঠ ছাড়ার দৃশ্যটা একবার চোখের সামনে আনতে হবে। উত্তর খুঁজতে গেলে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ড্রেসিংরুমের দিকে তাকাতে হবে। চেলসির কাছে ২-০ গোলে হারের ম্যাচে মার্তিনেজের লাল কার্ড পাওয়ার ঘটনা আসলে ইউনাইটেডের চলমান দুর্দশার ছোট্ট একটি প্রতিচ্ছবি। কথাটা বলার অধিকার নিশ্চয়ই তাঁর আছে। কিন্তু এসব কথা তাঁকেই মানায়, যিনি মাঠে নিজের কাজটাও দারুণভাবে করেন। মার্তিনেজের প্রতিরোধ বলতে কিছুই চোখে পড়েনি। চোট পাওয়া নিশ্চয়ই কোনো ফুটবলারের অপরাধ নয়। অন্তত হিসাবের খাতা থেকে একটা বোঝা নামবে।

ম্যাচটিতে মার্তিনেজ প্রথমে মরগান রজার্সকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন। এর মাত্র সাড়ে তিন মিনিটের ব্যবধানে ওয়েসলি ফোফানার ওপর তিনি যে বিপজ্জনক ঝাঁপিয়ে পড়া প্রদর্শন করেন, তা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। বলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না থাকলেও প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের ওপর এই আক্রমণাত্মক আচরণে রেফারি পিটার ব্যাংকস ভিএআর দেখে তাঁকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। চেলসি এ ঘটনার সুবাদে পেনাল্টিও পায়। তবু ফরাসি ডিফেন্ডারের ওপর এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, যেন ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা আছে। রেফারি পিটার ব্যাংকস ভিএআর মনিটরে একবার চোখ বুলিয়েই বুঝে গেলেন, আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারের জন্য আর কোনো ছাড় নেই। লাল কার্ডের সঙ্গে চেলসিকে পেনাল্টিও দিলেন।

সিদ্ধান্তের পর রেফারির সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়াতে চাইলে সতীর্থরা তাঁকে সরিয়ে নেয়। সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ মার্তিনেজ তখন রেফারির সঙ্গে ঝামেলায় জড়াতে যাচ্ছিলেন।

মাঠ থেকে বের হওয়ার সময় কোচ মাইকেল ক্যারিকের দিকে তাকানোর সাহসটুকুও যেন তাঁর ছিল না। অথচ এই ক্যারিকই একসময় তাঁকে দলের প্রয়োজনে সুযোগ দিয়েছিলেন। গত অক্টোবরে আতলেতিকো মাদ্রিদের কাছে হারার পর মার্তিনেজ ক্লাবের পরিচালকদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, গ্রীষ্মকালীন দলবদলে খেলোয়াড় কেনার ক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ। তিনি টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের কাছ থেকে আরও ভালো কাজ প্রত্যাশা করেছিলেন। রেকর্ড ট্রান্সফার ফি দিয়ে কেনা চেলসির উইঙ্গার তাঁকে ফাউল করেছিলেন, সেটি সম্ভবত ভালো লাগেনি মার্তিনেজের। ক্লাবের দলবদল নীতি নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতে পারেন, পরিচালকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারেন।

ইউনাইটেডের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি প্রিমিয়ার লিগে তাদের অবনমন অঞ্চলের কাছাকাছি নিয়ে গেছে। এমন সময়ে মার্তিনেজের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ের কাছ থেকে নেতৃত্ব ও প্রতিরোধের আশা ছিল সমর্থকদের। চেলসির প্রথম গোলের সময় রজার্সকে আটকানোর কোনো লক্ষণই তাঁর মাঝে দেখা যায়নি। মাঠের বাইরে পরিচালকদের সমালোচনা করতে পারলেও, মাঠের ভেতরে নিজের দায়িত্ব পালনে তিনি ব্যর্থ হচ্ছেন।

মার্তিনেজের ইউনাইটেড ক্যারিয়ার পরিসংখ্যানও তেমন সুখকর নয়। চার বছর ছয় মাসে তিনি লিগে মাত্র ৭২টি ম্যাচ খেলেছেন। বারবার ইনজুরিতে পড়ে তিনি মাঠের বাইরে থেকেছেন প্রায় ৬০৯ দিন। ২০২২ সালে আয়াক্স থেকে এরিক টেন হাগের হাত ধরে ৪ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ডে ইউনাইটেডে আসার পর থেকে তাঁর পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতার বড় অভাব রয়েছে। এমতাবস্থায় জানুয়ারিতে তাঁকে বিক্রি করে দিলেও ক্লাব হয়তো লোকসান গুনতে দ্বিধা করবে না। চার বছর ছয় মাসে লিগে খেলেছেন মাত্র ৭২ ম্যাচ। চোটের কারণে মাঠের বাইরে ছিলেন ৬০৯ দিন। সেই টেন হাগই ইউনাইটেডকে রাজি করিয়েছিলেন তাঁকে ৪ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ডে কিনতে। কিন্তু সুস্থ অবস্থায়ও তাঁর পারফরম্যান্সে যে অধারাবাহিকতা, সেটি প্রশ্ন তুলবেই। আর্জেন্টিনা দলে তাঁর পারফরম্যান্স দেখেও নামটা মানানসই মনে হয়।

আমস্টারডামে থাকাকালীন তিনি ‘দ্য বুচার’ বা কসাই ডাকনামটি পেয়েছিলেন তাঁর আগ্রাসী ট্যাকলের জন্য। সেই দক্ষতা এখন ইউনাইটেডে এসে অনেকটা এলোমেলো হয়ে গেছে। এ বছর এটি তাঁর দ্বিতীয় লাল কার্ড। গত এপ্রিলে লিডসের বিপক্ষে ডমিনিক কালভার্ট-লুইনের চুল টেনে ধরে মাঠ ছাড়া মার্তিনেজকে সেবার কোচ ক্যারিক সমর্থন দিলেও, এবার আর কোনো বাড়তি কথা বলেননি। প্রতিপক্ষকে ভয় ধরানো ট্যাকলের জন্যই এই ডাকনাম। ট্যাকলের টাইমিং এতটাই এলোমেলো যে দেখলে মনে হয়, যেকোনো মুহূর্তে কার্ড খেয়ে যাবেন।

জাতীয় দলের জার্সিতে মার্তিনেজ অত্যন্ত কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য। আর্জেন্টিনার হয়ে গত দুটি বিশ্বকাপে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর সঙ্গে তাঁর জুটি ছিল দারুণ শক্তিশালী। সেখানে তিনি যতটা আগ্রাসী ও আত্মবিশ্বাসী, ক্লাবের রক্ষণে যেন ততটাই অকার্যকর ও একা। মাঠের লড়াইয়ে দলের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ানো এই ডিফেন্ডারকে এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমর্থকেরা ‘গোলমাল পাকানো লোক’ হিসেবেই অভিহিত করছেন। সেখানে যুক্তিবুদ্ধির উপস্থিতি অনেক দিন ধরেই অনিয়মিত।