পুলিশপ্রধানের ক্রসফায়ার সংক্রান্ত বক্তব্য ও নাগরিক নিরাপত্তায় শঙ্কা

Published: October 27, 2026, 4:42 am

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য প্রায়ই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অভিমুখী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর চকবাজারে একটি ব্যাংকিং অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির যে বক্তব্য রেখেছেন, তা কেবল অপ্রত্যাশিত নয়, বরং নাগরিক নিরাপত্তার মৌলিক অধিকারকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। তিনি স্পষ্টত বলেছেন যে, সরকার যদি অনুমতি দেয়, তবে পুলিশ ক্রসফায়ারের মতো বিচারবহির্ভূত পদক্ষেপ গ্রহণে দ্বিধা করবে না। রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনকারী একটি বাহিনীর প্রধানের কাছ থেকে এ ধরনের উক্তি পুরোনো সহিংসতার স্মৃতিকে পুনরায় জাগ্রত করেছে। পুলিশের আইজি যা বলেছেন, তাতে নাগরিক হিসেবে ভীত হওয়ার এবং পুরোনো সহিংসতার স্মৃতি জেগে ওঠার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আইজিপি বলতে চান, পুলিশের সদস্যরা কেউ অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাশাপাশি গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে এ ধরনের ঘটনার যে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হয়েছে, তাতে রাষ্ট্র বিনা বিচারে কাউকে প্রাণে মেরে ফেলতে পারে না, সে বিষয়ে ঐকমত্যই ছিল মূল সুর। এ কথাটি অন্তত ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই বলা যায় না।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অসাংবিধানিক অবস্থান

আইজিপির এই মন্তব্যের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘ক্রসফায়ার’ নামক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে একটি বৈধ হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করা। সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, আইনানুগ প্রক্রিয়া ব্যতীত কোনো নাগরিককে তার জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। অথচ পুলিশপ্রধানের বক্তব্যে ক্ষমতার এমন এক দম্ভ ফুটে উঠেছে যা আইন ও সংবিধানের সীমানাকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ইঙ্গিত দেয়। এটি নাগরিকদের জন্য একটি ভীতিকর বার্তা, বিশেষত যখন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে সংস্কার ও নাগরিকবান্ধব করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এবার আসা যাক আমাদের মূল আশঙ্কার জায়গায়—ক্রসফায়ার।

প্রয়োজনীয়তার ধোঁয়াশা ও আত্মরক্ষার অজুহাত

আইজিপি ‘দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত’ পুলিশের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে নিজেকে দায়বদ্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন। তবে নাগরিক সমাজ কখনোই পুলিশের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি, বরং প্রশ্ন তুলেছে তাদের কার্যপদ্ধতি ও জবাবদিহিতা নিয়ে। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রায়শই ‘আত্মরক্ষা’ বা ‘আইনি সুরক্ষা’র দোহাই দিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়। অতীতে র‍্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ডে আমরা এমন সব প্রেসনোটের পুনরাবৃত্তি দেখেছি, যা কার্যত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোকে বৈধতা দেওয়ার কৌশল মাত্র। যখন রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকের প্রাণের নিরাপত্তার বদলে ঘাতক হয়ে ওঠে, তখন সেই শাসন ব্যবস্থার ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজন, এটা স্বীকার করে নিয়ে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী আমাকে দায়িত্ব পালন করতে দিন।’। আমাদের সরকার, রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠানগুলো যে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে কিছুই শিখতে চায় না এবং অতীত ভুলের পুনরাবৃত্তি করার বাসনা যে ত্যাগ করতে পারে না, তা দুই দিন পরপর আমরা বুঝতে পারি। আমাদের কর্তাব্যক্তিরা বুঝিয়ে দেন, এই রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানকে তাঁরা কোনোভাবেই নাগরিক অভিমুখী করতে আগ্রহী নন। আর যে প্রশ্নটি উঠছে তা হচ্ছে, তারা কি নাগরিকের জন্য সুরক্ষা বলয় তৈরি করবে, নাকি নাগরিকের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে। ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কতটা আইনি, কতটা বেআইনি কিংবা কতটা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন, তা ২০০৪ সালের পর থেকে কখনোই তর্কের বিষয়ই ছিল না। শুরু থেকেই দুনিয়ার প্রায় সব মানবাধিকার সংগঠন এগুলোর বিরোধিতা করে অজস্র নিন্দা জ্ঞাপন করেছে। এমনকি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে র‍্যাবের (বর্তমানে র‍্যাব বিলুপ্ত হয়ে এসআরবি হয়েছে) সম্পৃক্ততার জন্য আন্তর্জাতিক মহল থেকে অনেকবারই র‍্যাব নিষিদ্ধের সুপারিশও এসেছে। দ্বিতীয়ত, সরকার চাইলেই কি তিনি নাগরিকের প্রাণহানি ঘটাতে পারেন। এ কারণেই সব আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সরকারি প্রেসনোটের ভাষা ও যুক্তিকাঠামো সর্বদা সমান থাকে। এই যদি হয় কোনো বাহিনীপ্রধানের অবস্থান, তাহলে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে তদন্ত কে করবে—এই প্রশ্নের গুরুত্ব আবার সামনে চলে আসে।

তদন্ত ও জবাবদিহিতার ঘাটতি

আইজিপি দাবি করেছেন যে, পুলিশ বাহিনীতে অপরাধের বিপরীতে অভ্যন্তরীণ ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিদ্যমান।

কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

অতীতের পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা যেমন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের রিপোর্ট বলছে যে, ডিবিসহ পুলিশ বাহিনীর বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার হার র‍্যাবের চেয়েও বেশি ছিল। ক্রসফায়ারের সঙ্গে র‍্যাবের নাম সব সময় উচ্চারিত হলেও পুলিশ বাহিনীও এতে জড়িত। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ তাদের প্রতিবেদনে বলেছিল, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ডিবিসহ পুলিশ বাহিনীর (৪৮.০৫ শতাংশ) সম্পৃক্ততা র‍্যাব বাহিনীর (৩১.৯ শতাংশ) চেয়ে বেশি ছিল।

উদাহরণস্বরূপ, বহুল আলোচিত সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশের প্রসঙ্গটি উল্লেখ করা জরুরি। যেমন টেকনাফ থানার বহুল আলোচিত সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ বন্দুকযুদ্ধের জন্য ২০১৯ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ পদক ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ বা বিপিএম পেয়েছিলেন।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত হওয়ার পরেও তিনি পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ (বিপিএম) অর্জন করেছিলেন, যা প্রমাণ করে যে বাহিনী হিসেবে তারা এসব ঘটনাকে অপরাধ বলে গণ্য করে না, বরং বাহবা পাওয়ার যোগ্য কৃতিত্ব হিসেবেই দেখে থাকে। পদক পাওয়ার জন্য তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে যে ছয়টি কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করেন, তার সব কটি ঘটনাতেই আসামি নিহত হয়েছিলেন (, ৬ আগস্ট ২০২০)।

নাগরিক প্রত্যাশা বনাম বাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি

  • বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে আন্তর্জাতিক মহলের দীর্ঘদিনের দাবি উপেক্ষা করা হয়েছে।
  • পুলিশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের নামে কার্যত কোনো কার্যকর পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
  • রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রধানের প্রকাশ্য বক্তব্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মানসিকতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত।
  • জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল ন্যায়বিচার ও প্রাণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
  • টিআইবির মতো সংগঠনগুলো আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার ও ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়েছে।
  • গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের ভূমিকা হওয়া উচিত আইন প্রয়োগকারী, ঘাতক নয়।

পরিশেষে, একজন পুলিশ প্রধানের কাছ থেকে যখন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায়, তখন সেটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি বিপজ্জনক মানসিকতার প্রতিফলন, যা পুলিশ বাহিনীর ভেতর গেড়ে বসে আছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এই বক্তব্যের বিষয়ে দ্রুত স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করা এবং বাহিনীতে শৃঙ্খলা ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সংস্কৃতি গড়ে তোলা। অন্যথায়, নাগরিকের মনে যে ভীতি ও অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হয়েছে, তা রাষ্ট্র সংস্কারের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। আইজিপির বক্তব্য প্রত্যাহার ও এর ব্যাখ্যা দাবি করা এখন সচেতন মহলের একটি যৌক্তিক দাবিতে পরিণত হয়েছে।